শাপমুক্তির নয়া সঙ্কল্পের নাম ‘বাভূমা ব্রিগেড’
সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়
‘মানসিক চাপ’। খেলার দুনিয়ায় সম্ভবত সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত শব্দ। যারা খেলাধূলা করেছেন তারা সকলেই বলবেন যে সবসময় চাপ থাকে। ভক্ত, অভিভাবক, স্পনসর, পরিবার এবং সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণভাবে নিজের কাছ থেকে। দিনের শেষে একজন ক্রীড়াবিদ একাকী তার নিজের মনের সাথে লড়াই করে। সমস্ত চিন্তাভাবনা যা ক্রমাগত আসে, ভারসাম্যকে বিঘ্নিত করে এমন সম্ভাবনা এবং অবশেষে কী হতে পারে তার সমস্ত আশা এবং প্রত্যাশা। এই সবকিছু নিয়েই চলতে থাকে মানসিক দ্বন্দ্ব ও বিড়ম্বনা। আর সেই মানসিক চাপ উত্তরণ করে
একটি দেশ বা জাতিকে নতুন করে উজ্জীবিত করেছে বাভুমা ব্রিগেড।
আইসিসি টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ জয় খেলার দুনিয়ায় ম্যান্ডেলার দেশকে চিরতরে বদলে দিয়েছে। তারই প্রতিফলন মিলল ক্রিকেটের নন্দন কাননে।
ইডেনে টেস্ট জয়ের মাধ্যমে নেলসন ম্যান্ডেলার দেশ নয়া ইতিহাস গড়ল সন্দেহ নেই যার মূল নায়ক হলেন পাঁচ ফুট তিন ইঞ্চির কৃষ্ণাঙ্গ টেম্বা বাভূমা।
দীর্ঘ নির্বাসনের পর দক্ষিণ আফ্রিকা ক্রিকেটের প্রত্যাবর্তনের মঞ্চ ছিল কলকাতার ইডেন গার্ডেন। কেপলার ওয়েসেলস, হ্যান্সি ক্রোনিয়ে, অ্যালান ডোনাল্ড, জন্টি রোডস, গ্যারি কারস্টেন, হাডসন, ম্যাকমিলান-দের মত বিশ্বমানের ক্রিকেটারদের নিয়ে হাজির হয়েছিল আলি বাখারের দল। যদিও ইডেনে টেস্ট জয়ের স্বাদ পায়নি ম্যান্ডেলার দেশ। দক্ষিণ আফ্রিকানরা চাপের মুখে জিততে পারে না, এটাই ছিল স্বীকৃত বক্তব্য। দক্ষিণ আফ্রিকান ক্রিকেটে এই
‘ চোকার ‘ তকমা দূর করার আকাঙ্ক্ষা দীর্ঘদিনের। কেপলার ওয়েসেলস থেকে হ্যান্সি ক্রোনিয়ে অথবা ডোনাল্ড-কারস্টেন-জন্টি রোডস-রা যে চাপের কাছে নতিস্বীকার করে বারবার লক্ষ্যপূরণ থেকে দূরে রয়ে গিয়েছিলেন সেখানেই বাজিমাত করে যাবতীয় চাপের বিরুদ্ধে লড়াইয়ে জয়ী হয়ে দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেট ইতিহাসকে উত্তরণের পথ দেখায় বাভূমা ব্রিগেড। প্রথমে
বিশ্ব টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ জয়, টানা এগারোটা টেস্ট জয়ের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ক্রিকেটের নন্দনকাননে প্রথম টেস্ট জয়। যেন শাপমুক্তির মঞ্চ তৈরি করলেন বাভূমা-হার্মাররা। যাবতীয় চাপ, চরম প্রতিকূলতা কাটিয়ে একটু একটু করে মনের মধ্যে সাহস সঞ্চয় করে ভেতরের দানবদের কাটিয়ে উঠে শুধু ভারতের বিরুদ্ধে নয় বরং নিজেদের বিরুদ্ধেও জয়লাভ করল ওরা। নিজেদের জাতিসত্তার নতুন পরিচয় সৃষ্টি করলেন। ‘ চোকার ‘ তকমা ভেঙে সমালোচকদের ভুল প্রমাণিত করতে মরিয়া ছিল বাভূমার দল। আগেই টেস্ট চ্যাম্পিয়নশিপ জিতে দেশবাসী তথা ভক্তদের নতুন জীবনরেখা এবং খেলাধূলার জগতে নতুন মনন তৈরি করে লড়াকু মানসিকতার নয়া ইতিহাস লেখার সুযোগ করে দিয়েছিলেন বিশ্ব ক্রিকেটের ‘চোকার’-রা। এবার ইডেন জয় শুধু তাঁদের বীরগাঁথাই নয় বরং শাপমুক্তির স্বস্তিও।
আসলে খেলাধূলা এমনই। আর মানসিক চাপ যেকোনও খেলোয়াড়কে একটি নির্দিষ্ট দিনে সেরা অথবা সবচেয়ে খারাপ করে তোলে। দক্ষিণ আফ্রিকা বিশ্বাস করেছিল যে তারা এই মানসিক উত্তরণ করতে পারবে। সব প্রতিকূলতা দূর করে এমন এক নতুন রূপকথা লিপিবদ্ধ করবে যা একটি প্রজন্মকে শুধু নয় একটি জাতির সমস্ত প্রজন্মকে অনুপ্রাণিত করবে। বিশ্বজুড়ে খেলাধূলার ইতিহাসকে নতুনভাবে রচনা করবে এবং ভবিষ্যতের জন্য একাধিক সম্ভাবনার দরজা খুলে দেবে। আরও গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল প্রতিটি বর্ণের পুরুষের কাছে বাভূমার আকাঙ্ক্ষা থাকবে। দক্ষিণ আফ্রিকার জাতীয় ক্রিকেট দলের অধিনায়কের দায়িত্ব পাওয়ার পর থেকেই যেভাবে বাভূমাকে বর্ণ বৈষম্যের কালো দাগ, ক্রিকেটার সুলভ শারীরিক গঠন না থাকা সর্বোপরি ক্রিকেট কেরিয়ার নিয়ে প্রশ্নবাণে বিদ্ধ হতে হয়েছিল তার যাবতীয় জবাব দেওয়ার জন্য গোটা বাভূমা ব্রিগেডকে যেন লর্ডস থেকে ইডেনের মঞ্চে জীবনের হাতিয়ার হিসেবে ক্ষেত্র প্রস্তুত করেছিল। তাই এই জয় নিছক একটি টেস্ট জয় নয় নিজের দেশ, জাতি এবং বিশ্ব ক্রিকেটকে অনেকগুলো প্রশ্নের উত্তর দিতেই বাইশ গজের যুদ্ধে নেমেছিল বাভূমা ব্রিগেড।
” যদি ওরা পারে, তাহলে আমরাও পারব ” গোটা বিশ্বে স্বপ্নপূরণের এই নতুন সংকল্পের নজির সৃষ্টি হল। এমন একটি নজির যা দক্ষিণ আফ্রিকার ক্রিকেটকে বদলে দিয়েছে চিরকালের জন্য।
২০২৫- এর ক্রিকেটবিশ্ব যেন চোকারদের জন্যই। শুরু হয়েছে আইপিএল থেকে বিরাট কোহলিদের হাত ধরে। এবার সেই ব্যাটন এগিয়ে নিয়ে চলেছে বাভূমা-রা। শুধু ক্রিকেটের মঞ্চই নয়, ২০২৫ সালের আন্তর্জাতিক স্তরে ফুটবলের মহারণ লক্ষ্য করলেও দেখা যাচ্ছে লক্ষ্য পূরণের মঞ্চে সফল হয়েছেন ‘ চোকার্স ‘ রাই।
উয়েফা ইউরোপা লিগ চ্যাম্পিয়ন হয়ে চলতি বছরেই সেরার শিরোপা পেয়েছে অন্যতম চোকার্স
টটেনহাম হটস্পার্স। গত ১৭ বছর ধরে যাদের ভাগ্যে জোটেনি কোনও ট্রফি তারাই এবার ইউরোপা লিগ চ্যাম্পিয়ন। একইভাবে উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগেও এবার নয়া ইতিহাস। ইউরোপ সেরার তকমা পেয়েছে প্যারিস সাঁ জারমা বা পিএসজি। একাধিকবার উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগের সেমিফাইনালে উঠলেও এমনকি ২০২০ সালের ফাইনালে উঠে ট্রফি জয়ের খরা কাটেনি পিএসজির। ২০২৫-এ ফুটবল ইতিহাসে প্রথমবারের জন্য উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স লিগ জয় করেছে লিওনেল মেসি, নেইমার, এমবাপে দের প্রাক্তন ক্লাব পিএসজি। তারকা খ্যাত হয়েও চ্যাম্পিয়ন্স লিগের ট্রফি জয় অধরাই রয়ে গিয়েছিল পিএসজির। চলতি বছরেই ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোরা উয়েফা চ্যাম্পিয়ন্স ট্রফি জিতে দীর্ঘদিনের স্বপ্নপূরণ করেছেন। সত্যিই, ২০২৫ যেন বিশ্ব ক্রীড়ায় পালাবদলের সন্ধিক্ষণ।

