বিশেষহেডলাইন

নির্বাচনী আইনে অস্তিত্বহীন ‘এনুমারেশন ফর্ম ‘ ! মর্জিমাফিক আইন প্রয়োগের অভিযোগ প্রাক্তনীদের

সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়

আইনের ফাঁক গলে নিজেদের মর্জি অনুযায়ী নির্বাচনী প্রক্রিয়া পরিচালনা করছে নির্বাচন কমিশন ? এসআইআর প্রক্রিয়ার প্রথমিক পর্বের শেষ পর্যায়ে পৌঁছেও এই প্রশ্ন পিছু ছাড়ছে না কমিশনের। শুধু রাজ্যের শাসক বা অবিজেপি বিরোধীপক্ষরাই নয়, এই প্রশ্ন উঠছে প্রাক্তন নির্বাচনী কর্তা বা সিইও-দের পক্ষ থেকেই। ভারতীয় জনপ্রতিনিধিত্ব আইন ১৯৫০ এবং ১৯৬০ মোতাবেক ভোটার তালিকার ইনটেনসিভ বা নিবিড় সংশোধনের কথা উল্লেখ থাকলেও ‘ স্পেশাল ‘ শব্দটির উল্লেখ নেই। তা সত্ত্বেও স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন নাম দিয়ে ছাব্বিশের নির্বাচনের ঠিক আগের বছরেই ভোটার তালিকার নিবিড় সংশোধন করার উদ্যোগ নিয়েছে জ্ঞানেশ কুমারের নির্বাচন কমিশন। তড়িঘড়ি এসআইআর-এর সিদ্ধান্ত, নির্বাচন কর্মীদের উপর লাগাতার চাপ বৃদ্ধি, নিত্যনতুন গাইডলাইন যুক্ত করে এসআইআর পদ্ধতিকে জটিল করে তোলা এসব নিয়ে রাজনৈতিক চর্চা বা অভিযোগ প্রথম থেকেই রয়েছে। কিন্তু যারা একদা অতিরিক্ত জেলাশাসক পরে জেলাশাসক এবং আরও পরে রাজ্যের সিইও বা মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক পদে একাধিক নির্বাচন পরিচালনা করেছেন তাঁরা এই সমস্যার টেকনিক্যাল দিক নিয়েও প্রশ্ন তুলছেন। বিশেষ করে যে আইনের বলে নির্বাচন কমিশন দেশজুড়ে নির্বাচন পরিচালনা করে সেই ভারতীয় জনপ্রতিনিরিত্ব আইন ১৯৫০ এবং ১৯৬০-এর বিধান এক্ষেত্রে কতটা মান্যতা পাচ্ছে তা নিয়ে প্রশ্ন তোলা হয়েছে। অভিযোগ, এসআইআর প্রক্রিয়া ও পদ্ধতির জন্য আইনের ‘ বিটুইন দ্য লাইন ‘ ব্যাখ্যা গ্রহণযোগ্য মনে করলেও ত্রুটি-বিচ্যুতির ক্ষেত্রে আইনকে অক্ষরে অক্ষরে মেনে তাকেই বর্ম করতে চাইছে কমিশন।

মূলত ভারতীয় জনপ্রতিনিধিত্ব আইনে নির্বাচন পরিচালনার কোনও নির্দিষ্ট পদ্ধতি বা নির্দিষ্ট সময়ের উল্লেখ নেই। সে কারণেই বরাবরই নির্বাচন কমিশন পরিস্থিতির সাপেক্ষে এই আইনকে নিজেদের মতো করে ব্যবহার করার সুযোগ পায় বলে মত প্রাক্তনীদের। নিত্যনতুন সিস্টেমের কবলে পড়ে নির্বাচন প্রক্রিয়া যেমন জটিল হয় তেমনি নির্বাচনের পরিচালনার সঙ্গে যুক্ত সরকারি কর্মী এবং সাধারণ ভোটারদের বিড়ম্বনা বাড়ে।
বিড়ম্বনার মূল জায়গাগুলো কি?

প্রথমত, ইন্টেন্সিভ রিভিশন অনুযায়ী একজন বিএলও বাড়ি বাড়ি গিয়ে ভোটারদের তথ্য সংগ্রহ করে তা নিজেই লিপিবদ্ধ করবেন। এজন্য ভোটারকে কোনও ফর্ম পূরণ করতে হবে না। আইনের ফাঁক গলে ‘স্পেশাল’ শব্দটি যোগ করে এনুমারেশন ফর্ম ইনটেনসিভ রিভিশন প্রক্রিয়ার সঙ্গে যুক্ত করা হয়েছে। এসম্পর্কে অতীত অভিজ্ঞতার অভাব থাকায় কাজের ক্ষেত্রে বিড়ম্বনা বেড়েছে বিএলও ও ভোটারদেরও। ফর্ম পূরণের একাধিকবার পদ্ধতি পরিবর্তন এবং সার্ভার সমস্যা সামলে ডিজিটাইজেশন করতে গিয়ে বিড়ম্বনা আরও বেড়েছে।

দ্বিতীয়ত, ইন্টেন্সিভ রিভিশন ও নির্বাচনের মধ্যে যথেষ্ট সময় থাকা দরকার। ছাব্বিশের নির্বাচনের আগে নির্বাচনমুখী রাজ্যগুলোর ক্ষেত্রে সেই সময়ের অন্তর দেওয়া হয়নি বলে অভিযোগ। ফলে তাড়াহুড়ো করতে গিয়ে বাড়ছে বিড়ম্বনা।

তৃতীয়ত, ভারতীয় জনপ্রতিনিধিত্ব আইন অনুযায়ী ইনটেনসিভ রিভিশন হওয়ার কথা প্রতি পাঁচ বছর অন্তর। কোনও নির্বাচন কমিশনই সেই অন্তর সঠিকভাবে মান্যতা দেয় না। নির্বাচন কমিশনাররা নিজের মর্জিমতো আইনের প্রয়োগ করেন বলেও অভিযোগ। ফলে বিড়ম্বনা বাড়ার সম্ভাবনা স্বাভাবিক। বৈচিত্রের দেশ ভারতবর্ষে দেশজুড়ে একসঙ্গে রিভিশনের কাজ করাও তো অন্যতম বিড়ম্বনা!

রাজ্যের প্রাক্তন সিইও-দের মতে এই মর্জিমাফিক নিয়ম ভঙ্গের খেলা এই নতুন নয়, বরাবরই নির্বাচন কমিশন ভারতীয় জনপ্রতিনিধিত্ব আইনকে সম্পূর্ণ মান্যতা না দিয়ে নিজেদের মতো করে ব্যবহার করেছেন। একটি সাংবিধানিক সংস্থার পক্ষে যা অনুচিত এবং দুঃখজনক বলেও মন্তব্য করেছেন তাঁরা। তবে নির্বাচন কমিশনেরও পাল্টা যুক্তি রয়েছে। কমিশন কর্তাদের মতে, ” আইনে যখন নির্দিষ্ট করে কিছু বলা নেই তখন পরিস্থিতি অনুযায়ী নিয়মের পরিবর্তনে অসুবিধা কোথায়। দেশবাসীর গণতান্ত্রিক আধিকার রক্ষার জন্যই তো নতুন পদ্ধতি নেওয়া হয়েছে। স্পেশাল কথাটা যোগ করতে অথবা নির্দিষ্ট ফর্ম ব্যবহার করতে সুনির্দিষ্টভাবে কোনও আপত্তি করেনি ভারতীয় জনপ্রতিনিধিত্ব আইন।
বিচারবিভাগ বা আইনসভা কেউ এই এসআইআর-কে অসাংবিধানিক বলতে পারেননি, তাহলে এই প্রশ্নের যৌক্তিকতা কোথায়? ”

ভোটার তালিকার মত বড় কাজ পরিচালনার ক্ষেত্রে সময় নির্বাচনও একটা গুরুত্বপূর্ণ ফ্যাক্টর। প্রাক্তন সিইও-র মতে, নির্বাচনী বছরের আগের বছরেই রিভিশনের কাজ হওয়ায় সময় কম পাওয়া গেছে। কারণ, আগামী ৭ মে বিদায়ী সরকারের শেষ দিন। তার মধ্যে নতুন সরকার গঠন করতে হবে। সেক্ষেত্রে সর্বাধিক পয়লা মে-র মধ্যে নির্বাচন প্রক্রিয়া শেষ করে গেজেট নোটিফিকেশন করতে হবে নির্বাচন কমিশনকে । স্বাভাবিকভাবেই নির্বাচনী পদ্ধতি বা বিধিকে মান্যতা দিয়ে ফেব্রুয়ারির শেষে অথবা মার্চের শুরুতেই বিধানসভা নির্বাচনের বিজ্ঞপ্তি জারি করতে হবে কমিশনকে। এই পরিস্থিতিতে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা যদি ফেব্রুয়ারির মাঝামাঝি প্রকাশিত হয় সেক্ষেত্রে যদি কোন ভুল ত্রুটি থেকে থাকে তাহলে তা সংশোধনের জন্য সময় পাবে না কমিশন। কারণ একজন ভোটার যদি নতুনভাবে নাম তোলার জন্য বা ভুল ত্রুটি সংশোধনের জন্য কমিশনে আবেদন জানায় সেই আবেদন খতিয়ে দেখে তাকে হিয়ারিং করে বিষয়টি চূড়ান্ত করার ক্ষেত্রে অনেকটা দেরি হয়ে যাবে। এভাবে কাজের ক্ষেত্রে স্বাভাবিকভাবেই ভুলের সম্ভাবনা বেশি থাকে। তাই এসআইআর প্রক্রিয়া শুরুর জন্য সময় নির্বাচন যথেষ্ট গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত ছিল নির্বাচন কমিশনের কাছে বলে জানান প্রাক্তন নির্বাচনী কর্তা। অবশ্য রাজ্যের বর্তমান মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়াল এই যুক্তি মানতে নারাজ। তাঁর মতে,
” প্রতি বছরেই তো কোনও না কোনও রাজ্যে বা একাধিক রাজ্যে নির্বাচন লেগেই রয়েছে। তাহলে কি কোনদিনই কি ইনটেনসিভ রিভিশন করবে না কমিশন?” পাল্টা যুক্তি মনোজবাবুর। তিনি আরও যোগ করেন ” বিহার তো করে দেখিয়েছে। এটা দ্বিতীয় দফার এসআইআর। তাহলে এখানে হবে না কেন ? এই মুহুর্তে এসআইআর পর্বের প্রাথমিক পর্যায় প্রায় শেষের পথে। নিরন্তর এনুমারেশন স্ক্রুটিনির কাজ চলছে। এরপর হিয়ারিং প্রক্রিয়ার জন্য কমিশন তৈরি। হিয়ারিং পর্বে খুব বেশি সময় লাগার কথা নয়। সুপ্রিম কোর্ট এসআইআর প্রক্রিয়ার সাংবিধানিক বৈধতাকে মান্যতা দিয়ে প্রয়োজনে রাজ্যকে আরও বেশি কর্মীকে এসআইআর প্রক্রিয়ায় যুক্ত করতে বলেছে। সবমিলিয়ে কোনও কাজে দেরি বা ভুল হওয়ার সম্ভাবনা কেন থাকবে? যদি না কেউ ইচ্ছাকৃত ভুল করতে চায়।” সিইওর সাফ কথা ” আগের কমিশনগুলি কি করেছে বা কেন করেছে তা বিষয় নয় বরং আগে কেউ করেনি বলে জ্ঞানেশ কুমার করবেন না এই যুক্তি যথার্থ হতে পারে না।”

দ্রুত এসআইআর শেষ করার চাপ বিএলও-দের চরম পরিণতির দিকে যেভাবে ঠেলে দিয়েছে বলে অভিযোগ উঠেছে তাঁকে
“দুর্ভাগ্যজনক ” বলে উল্লেখ করে এপ্রসঙ্গে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে মুখ্যমন্ত্রীর লেখা উপর্যুপরি দুটি চিঠির বয়ান যথেষ্ট যুক্তিপূর্ণ বলেও মনে করেন রাজ্যের প্রাক্তন নির্বাচনী কর্তা। অবশ্য রাজ্যে নিযুক্ত স্পেশাল রোল অবজার্ভার অবসরপ্রাপ্ত আইএএস সুব্রত গুপ্ত স্পষ্ট জানিয়েছেন ” মনে রাখতে হবে নির্বাচন ও কোভিডের কাজে কোনও নির্দিষ্ট ডিউটি আওয়ারস হয় না। সরকারি কর্মীরা বিধিবদ্ধ সংস্থার নির্দেশ মোতাবেক কাজ করবেন সেটাই কাম্য।” সিইও মনোজ আগরওয়াল জানিয়েছেন ” বিএলও-রা এসআইআর কাজের জন্য নির্বাচন কমিশনের কাছে ডেপুটেশনে রয়েছেন। নির্বাচকদের তথ্য যাচাইয়ের মত গুরুত্বপূর্ণ কাজের দায়িত্ব তাঁদের কাঁধে। বিএলও-দের সুনিশ্চিত করতে হবে মৃত, স্থানান্তরিত, ডুপ্লিকেট ও অনুপস্থিত ভোটারের নাম যেন ভোটার তালিকা থেকে বাদ যায়। ত্রুটি ধরতে কমিশনের কাছে উপযুক্ত প্রযুক্তি আছে। কোনও ইচ্ছাকৃত ভুল ধরা পড়লে কমিশন আইনানুগ ব্যবস্থা নেবে। পশ্চিমবঙ্গ একমাত্র রাজ্য যেখানে বিএলও-দের ভুল সংশোধনের সুযোগ দিয়েছে, শাস্তি দেয়নি।”

Share with