বিশেষহেডলাইন

সীমান্ত নয় , রাজ্যজুড়ে ‘শহুরে ভূতের ‘ ঠেলায় চোখ কপালে কমিশন কর্তাদের

 

সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়

সীমান্ত নয়, রাজ্যের ভোটযজ্ঞে অস্বস্তি বাড়িয়েছে শহর ও শহরাঞ্চল।

এসআইআর পর্বে এনুমারেশন ফর্ম যদি মাপকাঠি হয় তাহলে অসংগৃহীত ফর্মের নিরিখে বাংলাদেশ সীমান্ত বা সীমান্তবর্তী এলাকাকে ছাপিয়ে কমিশনের অসস্তি বাড়িয়েছে খোদ শহর কলকাতা ও রাজ্যের শহরাঞ্চল। বুধবার পর্যন্ত পাওয়া সর্বশেষ তথ্যের ভিত্তিতে মৃত স্থানান্তরিত নিখোঁজ ও ডুপ্লিকেট এই চার ক্যাটেগরির অসংগৃহীত ফর্মের সংখ্যা সবচেয়ে বেশি উত্তর কলকাতা ও দক্ষিণ কলকাতায়। এক্ষেত্রে বিধানসভা হিসেবে শীর্ষস্থানে উত্তর কলকাতার জোড়াসাঁকো। শহরে অনীহা বা আরবান অ্যাপাথির দরুণ বহুতলে বুথ তৈরির পরিকল্পনা ভেস্তে গিয়েছে তাই নয়, সংগৃহীত ফর্মের এই তথ্য শহর ও শহরাঞ্চলে ভুয়ো ভোটারের অস্তিত্ব জানান দিয়ে কমিশনের কর্তাদের কপালে চিন্তার ভাঁজ বাড়িয়েছে।

কমিশন থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী রাজ্যে মোট ৭ কোটি ৬৬ লক্ষ ৩৭ হাজার ৫২৯ জন ভোটারের মধ্যে বুধবার সকাল পর্যন্ত পাওয়া তথ্যের ভিত্তিতে অসংগৃহীত ভোটারের সংখ্যা ৫৬ লক্ষ ৮০ হাজার ৪৮৬ জন । শতাংশের বিচারে যা ৭.৪১।
মূলত, একটি জেলায় মোট ভোটারের সংখ্যা অনুযায়ী অসংগৃহীত এনুমারেশন ফর্মের সংখ্যার তারতম্য হয়।
২০২৫ সালের ভোটার তালিকা অনুযায়ী একটি জেলায় মোট ভোটারের নিদেনপক্ষে ৫ শতাংশ ভোটারের অসংগৃহীত এনুমারেশন ফর্মের নিরিখে জেলাগুলির প্রথম একাদশ তৈরি করলে শীর্ষস্থানে রয়েছে কলকাতা উত্তর ( ২৫.৪৬) শতাংশ। ঠিক তার পিছনে রয়েছে কলকাতা দক্ষিণ (২৩.৫০) শতাংশ। তৃতীয় ও চতুর্থ স্থানে যথাক্রমে পশ্চিম বর্ধমান (১৩.১১) শতাংশ এবং হাওড়া (১০. ৮২) শতাংশ। পঞ্চম স্থানে রয়েছে শৈলশহর দার্জিলিং ( ৯.৩৭) শতাংশ। অর্থাৎ প্রথম পাঁচ লক্ষ্য করলে দেখা যাচ্ছে মৃত স্থানান্তরিত অথবা নিখোঁজ ভোটারের সংখ্যায় শহর এলাকার আধিক্য রয়েছে। ষষ্ঠ ও সপ্তম স্থানে রয়েছে উত্তর ২৪ পরগনা (৯.৩৩) শতাংশ এবং দক্ষিণ ২৪ পরগনা (৮.৪০) শতাংশ। পরবর্তী চারটি স্থান দখল করেছে যথাক্রমে কালিম্পং (৭.৯০) শতাংশ, পুরুলিয়া (৭.৬০) শতাংশ, আলিপুরদুয়ার (৭.৩৭) শতাংশ এবং উত্তর দিনাজপুর (৭.৩২) শতাংশ।
আমার সংগৃহীত ধর্মের নিরিখে সবচেয়ে কম পূর্ব মেদিনীপুর জেলা, ৩.৩০ শতাংশ। এই তালিকা থেকেই স্পষ্ট যে আগামী ১৬ ডিসেম্বরের খসড়া ভোটার তালিকায় এখনও পর্যন্ত রাজ্যে প্রায় ৫৭ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়া নিশ্চিত হয়েছে যারা অধিকাংশই ২০২৫ সালে শহর এবং শহরাঞ্চলের ভোটার হিসেবে নথিভুক্ত ছিলেন। অথচ বঙ্গে এসআইআর পর্বের শুরু থেকে যেভাবে বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকাগুলোকে টার্গেট করা হয়েছিল তাতে ভোটের বাইশ গজে ‘চায়নাম্যান’ বোলারের মতো চমক দিয়েছে রাজ্যের শহুরে এলাকা। বিধানসভাওয়াড়ি তথ্যে বিষয়টি আরও স্পষ্ট হয়েছে। যদি একটি বিধানসভার ১০ শতাংশ অসংগৃহীত ফর্মকে মাপকাঠি ধরা যায় তাহলে কলকাতা উত্তর ও কলকাতা দক্ষিণের ১১ টি বিধানসভায় সেই ন্যূনতম মাপকাঠি দাঁড়িয়েছে দ্বিগুণ। কলকাতা উত্তরের জোড়াসাঁকোয় রাজ্যের মধ্যে সবচেয়ে বেশি ৩৬.১৮ শতাংশ। ঠিক পিছনেই চৌরঙ্গী বিধানসভা (৩৪.৯৭) শতাংশ। উত্তর ও দক্ষিণ কলকাতা মিলিয়ে সবচেয়ে কম এন্টালি বিধানসভায়,১৯.৫৪ শতাংশ। কলকাতার যমজ হাওড়ার শহরাঞ্চলেও পরিসংখ্যান তথৈবচ। হাওড়া উত্তর বিধানসভায় অসংগৃহীত ফর্ম মোট ভোটারের ২৬.৯৫ শতাংশ। বর্ধমানের আটটি বিধানসভা কেন্দ্রে ও সংগৃহীত ফর্মের সংখ্যা গড়ে মোট ভোটারের প্রায় ১৩ শতাংশ বা তার বেশি। অথচ পুর্ব বর্ধমানের ১১ টি বিধানসভার একটিতেও এই শতাংশ ১০ পৌঁছয়নি। একই হাল দুই মেদিনীপুরেও। পূর্বের ১০ টি বিধানসভায় অসংগৃহীত ফর্মের সংখ্যা শতাংশের বিচারে নগণ্য হলেও পশ্চিম মেদিনীপুরের ১৫ টি বিধানসভার মধ্যে একমাত্র খড়গপুর সদরে এই শতাংশের হার ১০ এর উপরে, ১৮.৬৯ শতাংশ। অন্যদিকে শৈলশহর দার্জিলিং-এর মোট ভোটারের ১০.৬৩ শতাংশ এবং শিলিগুড়ি বিধানসভার ১২.৯৬ শতাংশ ভোটার এই ক্যাটেগরির অন্তর্গত। শহর এলাকায় অসংগৃহীত এনুমারেশনের বাড়বাড়ন্তের মূল কারণ ব্যাখ্যা করতে গিয়ে কমিশনের পদস্থ কর্তা জানান, ” গ্রামীণ এলাকায় বিএলও-রা সকলকে চেনেন, জানেন। কিন্তু শহর এলাকায় পাশের বাড়ির লোককেও ঠিকমতো বিএলও থেকে ভোটাররা। সেই বাস্তবতার ছবি প্রতিফলিত হয়েছে এক্ষেত্রে।” রাজ্যের সিইও মনোজ কুমার আগরওয়াল মনে করেন ” শহর এলাকায় এর আগে কোনদিনই ঠিক মতো স্পেশাল সামারি রিভিশন হয়নি। তারই ফলশ্রুতি ধরা পড়ছে এবারের এসআইআর -এ।”

উল্লেখযোগ্য, রাজ্যের শহর এলাকায় অসংগৃহীত ফর্মের আধিক্য থাকলেও শতাংশের বিচারে সীমান্তবর্তী জেলাগুলিতে মোট ভোটারের তুলনায় এধরনের ক্যটেগরির ভোটারদের সংখ্যা তুলনায় কম। বিশেষ করে মুর্শিদাবাদের ২১ টি বিধানসভা কেন্দ্রে বা নদিয়ার ১৭ টি বিধানসভা কেন্দ্রের একটিতেও এই ক্যাটেগরির ভোটারের সংখ্যা ১০ শতাংশে পৌঁছয়নি। বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী ৩৩ বিধানসভা আসনের উত্তর ২৪ পরগনার ক্ষেত্রেও ছবিটা বদলায়নি। জেলার সীমান্তবর্তী বনগাঁ , বাগদা বসিরহাট, গাইঘাটার তুলনায় অসংগৃহীত ফর্মের আধিক্য ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চল সহ রাজারহাট-নিউটাউন, বিধাননগর এলাকায় বেশি। মূলত, অবাঙালি অধ্যুষিত
ব্যারাকপুর শিল্পাঞ্চলের প্রায় গোটাটাই মৃত, স্থানান্তরিত অথবা নিখোঁজ বা ডুপ্লিকেট ভোটারে পরিপূর্ণ। বরং জেলা সদর বারাসাত-মধ্যমগ্রাম এই তালিকায় অনেকটাই পিছিয়ে। ৩১ বিধানসভা আসন বিশিষ্ট দক্ষিণ ২৪ পরগনাতেও ছবিটা প্রায় একই। বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী ও সুন্দরবন লাগোয়া সাগর,কাকদ্বীপ , ক্যানিং, গোসাবা, বাসন্তী, কুলপি, কুলতলি এলাকায় কাঙ্ক্ষিত প্যারামিটার মোটামুটি ঠিকঠাক থাকলেও বারুইপুর পুর্ব ও পশ্চিম সহ যাদবপুর , টালিগঞ্জ, সোনারপুর, মেটিয়াবুরুজ, বেহালা পুর্ব ও পশ্চিমের মতো শহুরে এলাকায় অসংগৃহীত ফর্মের সংখ্যাটা কাঙ্ক্ষিত মাপকাঠির থেকে অনেকটাই বেশি। উত্তরবঙ্গের ক্ষেত্রেও সীমান্তবর্তী জলপাইগুড়ি বা কোচবিহারে অসংগৃহীত কর্মের কম হলেও আলিপুরদুয়ার এই দুই জেলাতে কিছুটা হলেও ছাপিয়ে গিয়েছে। সব মিলিয়ে রাজ্যের সীমান্তবর্তী এবং প্রত্যন্ত এলাকা যেখানে খসড়া ভোটার তালিকায় ভোটারদের নাম বাদ পড়ার ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি সম্ভাবনাময় বলে এসআইআর পর্বের শুরুতে ধরে নেওয়া হয়েছিল এস আই আর এর প্রাথমিক পর্যায়ের শেষ পর্বে এসে সীমান্তবর্তী গ্রামীণ এলাকাই বরং স্বস্তি দিয়েছে কমিশনের কর্তাদের। আর শহুরে অনীহা দূর করে শহর ও শহরাঞ্চলের ভোটদানের হার ছাব্বিশের আসন্ন নির্বাচনে বিগত নির্বাচন গুলোর থেকে কমবে কিনা তা নিয়েই অস্বস্তি বাড়ছে কমিশন তথা সিইও দপ্তরের কর্তাদের।

Share with