হেডলাইন

ফিবছর রিভিশনের সাফল্যেই এসআইআর মানচিত্রে ‘ ব্যতিক্রম ‘ পশ্চিমবঙ্গ

সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়

এসআইআর পর্বে খসড়া ভোটার তালিকায় নাম বাদের নিরিখে অন্যান্য রাজ্যের তুলনায় পশ্চিমবঙ্গের ফল অপেক্ষাকৃত ভালো। এর নেপথ্যে বাম আমল থেকে পরিবর্তনের জমানাতেও সামারি রিভিশনের কাজের সাফল্যই অন্যতম কারণ বলে মনে করছেন ভোটার তালিকার পরিদর্শক হিসেবে দায়িত্বে থাকা কমিশনের উচ্চপদস্থ কর্তারা। ফিবছর নিত্য প্রক্রিয়া হিসেবে রাজ্যের সিইও দপ্তরের পরিচালনায় রাজ্য সরকারি কর্মীদের সহযোগিতায় ভোটার তালিকার সংশোধনের যে কাজ হয় অর্থাৎ সংযোজন বা বিয়োজনের মাধ্যমে ভোটার তালিকাকে আপডেট রাখার কাজই এক্ষেত্রে পশ্চিমবঙ্গকে অন্যদের থেকে ব্যতিক্রমী করেছে বলে মনে করা হচ্ছে। বিশেষ করে খসড়া ভোটার তালিকায় অযোগ্য ভোটার হিসেবে তামিলনাড়ু ও গুজরাটে ৯৪ লক্ষ করে নাম বাদ গেলেও বঙ্গে সেই সংখ্যা ৫৮ লক্ষ। যা রাজ্যে মোট ভোটারের প্রায় সাড়ে ৭ শতাংশ।

অথচ এই বঙ্গের মাটি থেকেই যোগ্য ভোটারদের নাম বেছে বেছে বাদ দেওয়ার অভিযোগে প্রথম এসআইআর বিরোধিতার সুর চড়িয়েছিলেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী সেই পশ্চিমবঙ্গে এসআইআরে কত নাম বাদ পড়বে তা নিয়ে প্রথম থেকেই রাজনীতির চর্চা ছিল তুঙ্গে।এসআইআর পর্বের শুরুতে পশ্চিমবঙ্গের সীমান্তবর্তী জেলাগুলোকে টার্গেট করে অভিযোগ উঠেছিল যে এই বঙ্গেই সবচেয়ে বেশি মৃত স্থানান্তরিত বা ভুয়ো ভোটার ধরা পড়বে। কিন্তু বাস্তবে প্রতিফলন উল্টো। বরং তামিল শরণার্থী অধ্যুষিত তামিলনাড়ু অথবা মুজাহির প্রভাবিত গুজরাটে বঙ্গের প্রায় দ্বিগুণ অযোগ্য ভোটারের নাম বাদ যাওয়ার ঘটনা রাজ্যে সামারি রিভিশনের সাফল্যের দাবিকেই জোরালো করেছে।
তবে সংখ্যার কচকচিতে যেতে নারাজ বঙ্গের এসআইআর পর্বে কমিশন নিযুক্ত শীর্ষ পদাধিকারী। তাঁর মতে, এসআইআর নিয়ে অন্যান্য রাজ্যের ভোটারদের মধ্যে যেমন আগ্রহ কম তেমনি বছর বছর রিভিশনের কাজও নিয়ম মেনে যে করা হয় না তা স্পষ্ট, আর তার জেরেই এই পরিণতি। তবে এসআইআর হওয়া দেশের সীমান্তবর্তী রাজ্যগুলোর মধ্যে পশ্চিমবঙ্গের রেজাল্ট যে ” আপ টু দ্য মার্ক ” তা মেনে নিয়েছেন কমিশন নিযুক্ত স্পেশাল রোল অবজার্ভার সুব্রত গুপ্ত। পাশাপাশি সুব্রতবাবু জানিয়েছেন, ” বঙ্গে বিএলও দের কাজ আপাতদৃষ্টিতে ভালো হয়েছে। বিশেষ করে গ্রামবাংলায় পারস্পরিক পরিচিতি এক্ষেত্রে যথেষ্ট কার্যকরী হয়েছে। সীমান্তবর্তী এলাকাতেও তার প্রভাব পড়েছে।”

তবে খসড়া ভোটার তালিকায় অন্য রাজ্যের তুলনায় আপাত সাফল্য মিললেও কমিশন তথা সিইও দপ্তরের মাথাব্যথার কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে প্রিজনি ভোটার ও আনম্যাপড ভোটার। সীমান্তবর্তী এলাকাসহ রাজ্যের প্রায় সব জেলাতেই প্রিজনি ভোটারদের মিসম্যাচ চিন্তা বাড়িয়েছে কমিশনের। রাজ্যে এসআইআর প্রাথমিক পর্ব শেষে আনম্যাপড ভোটারের সংখ্যা ৩০ লক্ষ ৫৯ হাজার ২৭৩। সেলফ ভোটার রয়েছেন ২ কোটি ৯৩ লক্ষ ৮১ হাজার ৬৮৩ জন এবং প্রিজনি ভোটার রয়েছেন ৩ কোটি ৮৩ লক্ষ ৭৬ হাজার ২৩১ জন যা রাজ্যের মোট ভোটারের প্রায় অর্ধেক। আনম্যাপড এবং প্রিজনি ভোটারদের পুনরায় খতিয়ে দেখার জন্য এখন তৎপর রাজ্য সিইও দপ্তর এবং কমিশন নিযুক্ত কেন্দ্রীয় অবজারভাররা। হিয়ারিং পর্বে ইআরও-এইআরও দের সঙ্গে যুক্ত থাকছেন মাইক্রো অবজার্ভাররা। কমিশন থেকে প্রাপ্ত তথ্য অনুযায়ী ৪৫ বছর বা তার বেশি ভোটার অথচ ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় নাম নেই এমন প্রিজনি ভোটারের সংখ্যা ২০ লক্ষ ৭৪ হাজার ২৫৬ জন, ৮৫ লক্ষ ১ হাজার ৪৮৬ জন ভোটারের বাবার নাম মিসম্যাচ হয়েছে, বাবার সঙ্গে ভোটারের বয়সের পার্থক্য মাত্র ১৫ বছর এ ধরনের প্রজেনি ভোটারের সংখ্যা ১১ লক্ষ ৯৫ হাজার ২৩০ জন, বাবা মায়ের সঙ্গে ভোটারের বয়সের পার্থক্য প্রায় ৫০ বছর এমন প্রিজনি ভোটারের সংখ্যা ৮ লক্ষ ৭৭ হাজার ১৩৬, দাদু অথবা ঠাকুরদার সঙ্গে বয়সের পার্থক্য চল্লিশ বছরের কম এমন ভোটারের সংখ্যা তিন লক্ষ ২৯ হাজার ১৫২, ভোটার তালিকার নাম অনুযায়ী লিঙ্গবৈষম্য রয়েছে এমন ভোটারের সংখ্যা ১৩ লক্ষ ৪৬ হাজার ৯১৮ জন। তবে ২০০২ সালে প্রযুক্তিগত উৎকর্ষতা অনেকটাই কম থাকায় এবং নির্দিষ্ট ডেটাবেস না থাকায় অনেকক্ষেত্রে ম্যাপিংয়ের ক্ষেত্রে যেমন সমস্যা হচ্ছে তেমনি যান্ত্রিক ত্রুটি বা কম্পিউটারে অক্ষর সমস্যা ম্যাচিংয়ের ক্ষেত্রে অন্তরায় হয়ে দাঁড়াচ্ছে। এমতাবস্থায় চেকিং-রিচেকিং শুধু নয়, বিভিন্ন সফটওয়্যারের মাধ্যমে ভূত তাড়ানো এবং উপযুক্ত প্রমাণপত্র সহ নির্দিষ্ট পদ্ধতিতে হিয়ারিংয়ের মাধ্যমে আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি ছাব্বিশের নির্বাচনের জন্য বঙ্গে নির্ভুল চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করতে বদ্ধপরিকর নির্বাচন কমিশন।

Share with