বিশেষহেডলাইন

প্রশাসনিক বিড়ম্বনা ও রাজনৈতিক শক্তির পার্থক্যে বঙ্গের হিয়ারিং পর্ব যেন ‘ অ্যাসিড টেস্ট ‘

সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়

এসআইআর প্রক্রিয়া ঘোষণার শুরু থেকেই বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী জেলাগুলোকে টার্গেট করে
‘ গেল গেল ‘ রব তুলেছিল বঙ্গের রাজনৈতিক দলগুলি। বিশেষ করে সংখ্যালঘু অধ্যুষিত সীমান্তবর্তী এলাকায় ” ভিনদেশী ” বলে তকমা দিয়েছিলেন অতি উৎসাহী রাজনৈতিক নেতারা। বাস্তবে সেই দাবি যে ‘ অশ্বডিম্ব ‘ প্রসব করেছে তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়েছে এনুমারেশন পর্ব। বিশেষ করে রাজ্যের সবচেয়ে বেশি সংখ্যালঘু অধ্যুষিত জেলা মুর্শিদাবাদ ও মালদহ জেলায় মৃত, স্থানান্তরিত বা ডুপ্লিকেট ভোটারের সংখ্যা সবচেয়ে কম। কমিশন সূত্রে জানা গেছে, নির্বাচনে অতি স্পর্শকাতর বলে পরিচিত মুর্শিদাবাদের ডোমকল বিধানসভা এলাকায় মৃত ভোটারের খোঁজই মেলেনি এসআইআর তথ্যে। অথচ নির্বাচনের দিন সাতসকালে গুলিগোলা-বোমাবাজি এমনকি খুনের ঘটনা জলঙ্গি-ডোমকলের পরম্পরা বলে মনে করা হয়। এহেন ডোমকলসহ মুর্শিদাবাদ-মালদহ বা সীমান্তবর্তী অন্যান্য জেলাগুলিতেও এসআইআর পর্বের দ্বিতীয় ধাপের হিয়ারিং প্রক্রিয়া নিয়ে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিকভাবে যথেষ্ট চিন্তা বাড়িয়েছে নির্বাচন কমিশনের।

প্রথমত, সংখ্যালঘু অধ্যুষিত এলাকায় রাজ্যের প্রধান বিরোধী দলসহ অন্য বিরোধী দলগুলির সাংগঠনিক শক্তি নিতান্তই নড়বড়ে। তার উপর রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী থেকে  শাসকপক্ষ লাগাতার এসআইআর ও নির্বাচন কমিশনের বিরোধিতায় সুর চড়াচ্ছেন। এমতাবস্থায় সরকারি কর্মী যারা হিয়ারিংয়ের কাজের সঙ্গে যুক্ত তারা শাসক-সংখ্যালঘু জোটের বিরুদ্ধে কতটা নির্ভীক হতে পারবেন সেটাও বড় প্রশ্নচিহ্ন দাঁড় করিয়েছে। সংখ্যালঘু এলাকায় শাসকদল ‘একাই একশো’ হওয়ায় ক্লেমস-অবজেকশন পর্বে ভোটারদের প্রকৃত তথ্য নিয়ে কটা অভিযোগ সামনে আসবে তা নিয়েও সন্দিহান কমিশনের কর্তারা। মৃত বা ভুয়ো ভোটার তালিকা থেকে বিয়োজনের জন্য অভিযোগ বা চ্যালেঞ্জ জানানো না হলে কমিশনের হাতে এমন কোনও ব্রহ্মাস্ত্র বা প্রযুক্তি নেই যা দিয়ে প্রকৃত তথ্য খূঁজে বার করতে পারবে কমিশন তা মেনে নিয়েছেন পদস্থ আধিকারিকরাই। সেক্ষেত্রে সব দলের রাজনৈতিক শক্তির সামর্থ্যের ভিত্তিতেই সত্যতার প্রতিফলন ঘটবে চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় এমনটাই মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। এখনও পর্যন্ত রাজ্যের প্রধান বিরোধী দল যেখানে ৫৫ হাজারের সামান্য বেশি বুথ লেভেল এজেন্ট দিতে পেরেছে সেখানে শাসকপক্ষের বিএলএ সংখ্যা সাড়ে ৬৮ হাজারের বেশি।
দ্বিতীয়ত, ইআরও এবং এইআরও সবমিলিয়ে ৩ হাজার ৩০০-র কিছু বেশি সরকারি কর্মী টানা প্রায় দেড় মাস ধরে এই হিয়ারিং বা শুনানি পর্ব চালাবেন। যেখানে প্রথম দফায় ৩২ লক্ষের বেশি আনম্যাপড ভোটারদের ডাকা হবে এবং তারপর তথ্যগত ভুলের কারণে ৮৪ লক্ষ এবং মিসম্যাচ হিসেবে আরও ১ লক্ষ ৩৪ হাজার ভোটারকে হিয়ারিংয়ে ডাকা হবে। সবমিলিয়ে প্রায় ১ কোটি ১৭ লক্ষ ভোটারদের হিয়ারিং করবেন তিন হাজারের কিছু বেশি রাজ্য সরকারি কর্মী। ফলে এই বিপুল সংখ্যার ভোটারদের হিয়ারিং করতে যেমন বেগ পেতে হবে তেমনি সমাজের উচ্চ-মধ্য ও নিম্ন বা প্রান্তিক শ্রেণীর মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা এক লাইনে দাঁড় করিয়ে শুনানির মাধ্যমে যাচাইয়ের কাজ বাস্তবিকই কঠিন কাজ বলে কমিশনের আধিকারিকদেরই আশঙ্কা। মাইক্রো অবজার্ভাররা প্রতিটি টেবিলে হাজির থাকলেও মিসম্যচ অথবা প্রিজনি ভোটারদের যাবতীয় তথ্য অনুসন্ধান করে প্রকৃত তথ্য উদ্ধারে কতটা সময় দেওয়া সম্ভব হবে তা নিয়েও নিশ্চিত নন পদস্থ আধিকারিকরাই।

প্রসঙ্গত, বিহার থেকে এসআইআর প্রক্রিয়া শুরু হলেও খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশের পর বিহারে ভোটারদের কোনও নোটিশ দেওয়া বা শুনানি পর্বের পাট ছিল না। সেই অর্থে ১২ রাজ্যেই প্রথমবারের জন্য এসআইআর প্রক্রিয়ার প্রাথমিক পর্ব শেষের পর ভোটারদের হিয়ারিং বা শুনানি হতে চলেছে পশ্চিমবঙ্গ সহ অন্যান্য রাজ্য ও কেন্দ্রশাসিত অঞ্চলগুলোতে। যেহেতু রাজনৈতিক সচেতনতা এবং নির্বাচনী সংবেদনশীলতার বিচারে পশ্চিমবঙ্গ সব সময় গোটা দেশের মধ্যে একটা বিশেষ মাত্রা অর্জন করে তদনুযায়ী বঙ্গের এই হিয়ারিং প্রক্রিয়া কার্যক্ষেত্রে ‘ অ্যাসিড টেস্ট ‘ হয়ে দাঁড়িয়েছে নির্বাচন কমিশনের কাছে। রাজনৈতিক পর্যবেক্ষক্দের মতে, হয়তো সেকারণেই হিয়ারিং পর্ব শুরুর আগে দিল্লির নির্বাচন সদনে ঝটিতি সফর সারলেন রাজ্যের সিইও।

Share with