যুক্তিগত অসঙ্গতিতে বিভ্রান্তি, কাদের অজ্ঞতা ও ভুলের মাশুল গুণছেন ভোটাররা ?
সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়
অজ্ঞতাই যাবতীয় ভুল ও ভুল বোঝাবুঝির মূল কারণ। রাজ্যে এসআইআর পর্ব যত এগোচ্ছে ততই এই আপ্তবাক্য স্পষ্ট হচ্ছে। আর ভুল বোঝাবুঝি যত বাড়ছে তত বেশি হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে সাধারণ মানুষ তথা ভোটারকে। প্রশ্ন উঠেছে, কার ভুল? আর ভুলের মাশুল গুনছেন কারা? এসআইআরের সৌজন্যে ‘ লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি ‘ বা যুক্তিগত অসঙ্গতি শব্দটির সঙ্গে এই প্রথন পরিচিত হয়েছে রাজ্যবাসী। যদিও কার ভুলে কাদের যুক্তিতে অসঙ্গতি তৈরি হচ্ছে তা নিয়ে ধন্দ রয়েছে সব মহলেই।
রাজ্যে এসআইআর শুরুর আগে থেকেই বিতর্ক দানা বেঁধেছিল। এসআইআর প্রক্রিয়ার মত রাজসূয় যজ্ঞ অল্প সময়ের মধ্যে সম্ভব নয় বলে অভিযোগ ওঠে। নির্বাচনের কয়েকমাস আগে বলে প্রশ্ন ওঠে এই প্রক্রিয়ার সময় নির্বাচন নিয়েও। রাজনৈতিক বাকবিতণ্ডা-বিক্ষোভ চরম আকার ধারণ করে যা এখনও বহমান। অন্যদিকে রাজ্যে প্রশাসনিক প্রধান হিসেবে মুখ্যমন্ত্রী দফায় দফায় দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে চিঠি দিয়ে এসআইআর প্রক্রিয়াকে হঠকারি, অপরিকল্পিত ও অপরিণামদর্শী হিসেবে উল্লেখ করে এসআইআর স্থগিতের দাবিতে অনড়। রাজনীতির আঙিনা থেকে প্রশাসনের দরবার এমনকি সাধারণ মানুষের কাছেও কমিশনের নিরপেক্ষতা স্বচ্ছতা এবং সিদ্ধান্তহীনতা নিয়ে বারবার প্রশ্নচিহ্ন তৈরি হয়েছে। এসআইআর প্রক্রিয়ার কাজ যত এগিয়েছে পরিস্থিতি অনুযায়ী বারবার বদলেছে নিয়ম, বদলেছে গাইডলাইন বেড়েছে নির্বাচন কর্মীদের কাজের চাপও। কাজ ও কর্মীর অনুপাত সামঞ্জস্যহীন হওয়ায় কাজে ভুলের ঝুঁকিও বেড়েছে। অথচ ভোটার তালিকা স্বচ্ছ ও ত্রুটিমুক্ত করতে উদ্ভুত পরিস্থিতির সঙ্গে পরিবর্তন ও পরিবর্ধন করা হচ্ছে বিভিন্ন গাইডলাইন বা কাজের পদ্ধতি। কিন্তু যাদের জন্য এই পরিবর্তন করা হচ্ছে সেই সাধারণ ভোটাররাই নতুন নতুন নিয়ম বা গাইডলাইন সম্পর্কে বহু ক্ষেত্রে অন্ধকারে রয়ে যাচ্ছেন। সুনির্দিষ্টভাবে কোনও নোটিফিকেশন না থাকায় কমিশনের ওয়েবসাইটে গিয়েও পরিবর্তিত গাইডলাইন নিয়ে কোনও স্বচ্ছ্ব ধারণা পাচ্ছেন না ভোটাররা। ফলে সিদ্ধান্তহীনতায় ভুগে রাজনৈতিক স্বার্থের বলি হচ্ছেন সাধারণ ভোটাররা। তার জেরে এনুমারেশন পর্ব থেকে শুনানি পর্বেও কোন নথি কোন কাজে প্রয়োজন বা কোন তথ্য সঠিক বা কিভাবে লিপিবদ্ধ করতে হবে তা জানতে সমস্যায় পড়ছেন সাধারণ ভোটাররা। পক্ষান্তরে, একদিকে শাসক ও অন্যদিকে কমিশনের সাঁড়াশি আক্রমণে দিশা হারাচ্ছেন নির্বাচনকর্মীরাও। বিএলও থেকে ইআরও এমনকি কিছু কিছু ক্ষেত্রে ডিইও বা জেলা নির্বাচনী আধিকারিকরাও কাজের গতিপ্রকৃতি নিয়ে বেসামাল হয়ে পড়ছেন। ২০০২ সালের ভোটার তালিকার সঙ্গে ২০২৫ সালের ভোটার তালিকার ম্যাপিং-এর ক্ষেত্রেও তথ্যের অসম্পূর্ণতা বা প্রযুক্তিগত সমস্যা একটা বড় অন্তরায় হয়ে দাঁড়িয়েছে নির্বাচন কর্মীদের কাছে। ২০০২ সালে কোনও ডিজিটাল ডাটাবেস না থাকায় বহু ক্ষেত্রেই হাতে লেখা নথির উপর নির্ভর করতে হচ্ছে নির্বাচন কর্মীদের। ২৩ বছর আগের সেই তথ্যের অস্পষ্টতা এবং তৎকালীন নির্বাচন কর্মীর অজ্ঞতার উপর নির্ভর করেই সাধারণ ভোটারদের শুনানি পর্বের ভাগ্য নির্ধারণ করতে হচ্ছে নির্বাচন কর্মীদের। আর এই যাবতীয় জটিলতার শিকার হচ্ছেন সাধারণ ভোটাররাই।
মূলত, এটা স্পষ্ট হয়েছে যে
অমর্ত্য সেন হোক বা সাধারণ প্রান্তিক মানুষ, ২০২৫ সালের ভোটার তালিকাতেও ভোটারদের নামের বানান, মিডল নেম বা নামের মধ্যবর্তী অংশ নিয়ে জটিলতা, বাবা অথবা মায়ের বয়সের সঙ্গে সন্তানের বয়সের ফারাক বা পদবিগত ভিন্নতা এমনকি আগেই ভুল সংশোধনের জন্য যে ফর্ম পূরণ করা হয়েছে তার সঙ্গে নতুন ভোটার তালিকা বা নতুন ভোটার কার্ডের ফারাক রয়েছে বহুক্ষেত্রেই। শুনানি পর্বে অতীতে নির্বাচন কর্মীদের সেই ভুলের খেসারত দিতে হচ্ছে বর্তমান নির্বাচনকর্মী থেকে সাধারণ ভোটারদেরই। ” লজিকাল ডিসক্রিপেন্সি ” নাম দিয়ে এই ত্রুটির শুনানিতেই কোটির বেশি ভোটারকে তলব করছে কমিশন। তার উপর চলতি এসআইআর পর্বে ঘন ঘন গাইডলাইন পরিবর্তনের ফলে খেই হারাচ্ছেন নিচুতলার নির্বাচন কর্মী থেকে সাধারণ ভোটাররাও। প্রতিদিনের পরিবর্তন রাজ্যের সিইও দপ্তর থেকে জেলা নির্বাচনী আধিকারিক অথবা ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসারদের চিঠির মাধ্যমে জানানো হলেও তা নিছকই নির্বাচন কর্মীদের ‘ ইন্টার অফিস এক্সারসাইজ ‘ । সাধারণ ভোটার এমনকি বেশ কিছু ক্ষেত্রে বিএলও-দের কাছেও সেই তথ্য যথাযথভাবে পৌঁছয় না। ফলে শুনানি কেন্দ্রে পৌঁছে হয়রানির শিকার হতে হচ্ছে সাধারণ ভোটারদের। সর্বোপরি সাধারণ মানুষের এই অজ্ঞতার সুযোগ দিয়ে নিজেদের রাজনৈতিক ফয়দা তোলার চেষ্টা করছেন রাজনীতির কারবারিরাও। শাসক দল থেকে বিরোধী পক্ষ যে যার নিজের রাজনৈতিক সুবিধার কথা মাথায় রেখে সাধারণ ভোটারদের বিভ্রান্তি বাড়াচ্ছেন। বেশ কিছু ক্ষেত্রে দেখা গিয়েছে যে রাজনৈতিক নেতা বা কর্মী এসআইআর সম্পর্কে প্রকৃত তথ্য জানেনই না অথচ তাদের কথা শুনে বিভ্রান্তির শিকার হতে হয়েছে সাধারণ ভোটারদের। একই কথা খাটে সিদ্ধান্তহীনতায় ভোগা, বিএলও-এইআরও দের ক্ষেত্রেও। কমিশনের কোপ এড়াতে নিজেরা সম্পূর্ণ না জেনে সাধারণ ভোটারদের বোঝাতে গিয়ে বিভ্রান্তি বাড়াচ্ছেন বেশ কিছু
বিএলও-এইআরও বলেও অভিযোগ। যদিও নিত্য নতুন গাইডলাইন পরিবর্তন ও বর্ধিত কাজের চাপের সঙ্গে তাল মেলাতেও হিমশিম খাচ্ছেন তাঁরা। সার্বিকভাবে অজ্ঞতা ও বিভ্রান্তির শিকার হওয়া ভোটারদের অসুবিধার কথা মানছেন রাজ্যে কমিশন নিযুক্ত স্পেশাল রোল অবজার্ভার সুব্রত গুপ্ত। এসআইআর প্রক্রিয়ার গাইডলাইনে নিত্য নতুন পরিবর্তন সম্বন্ধে সাধারণ মানুষকে সেভাবে সচেতন করা যায়নি বলেও মানছেন তিনি। এজন্য রাজ্যের গণমাধ্যমে অথবা সরকারি স্তরে যেভাবে প্রচার বা বিজ্ঞাপনের প্রয়োজন ছিল তা যেমন হয়নি তেমনি জেলায় জেলায় জেলা প্রশাসনগুলি মানুষের কাছে গাইডলাইন সম্পর্কে প্রকৃত তথ্য তুলে ধরতে পারেনি একথা মেনে নিয়ে সুব্রতবাবুর মন্তব্য ” এটা অবশ্যই একটি জরুরি বিষয়। এই দিকটা আরও একটু বেশি ভেবে দেখা উচিত। অজ্ঞতা থেকেই বিভ্রান্তি তৈরি হয় সেটা মাথায় রেখেই ভোটারদের কমিশন কি বলছে বা এসআইআরের গাইডলাইন নিয়ে আরও বেশি সচেতন করানো উচিত ছিল। এ বিষয়টি অবশ্যই গুরুত্ব দিয়ে ভেবে দেখতে হবে।” নির্বাচনী মেশিনারি যদি যথাযথভাবে কাজ না করে তাহলে ভোগান্তি হবে সাধারণ মানুষের এবং কাজে কষ্ট হবে বিএলও-দের তা মানছেন সিইও মনোজ কুমার আগরওয়াল। তবে এই পরিস্থিতির জন্য রাজ্য সরকারের অসহযোগিতাকেই ফের একবার কাঠগড়ায় তুলেছেন মনোজবাবু। তাঁর মন্তব্য ” রাজ্য তথ্য ও সংস্কৃতি দপ্তরের দুজন কর্মী সিইও দপ্তরে চারদিন কাজ করতে না করতেই তাঁদের তুলে নেওয়া হয়েছে। রাজ্য সরকার ডেটা এন্ট্রি অপারেটর না দেওয়ায় কষ্ট বেড়েছে বিএলওদের। কষ্ট করেও তাঁরা এনুমারেশন পর্ব যথেষ্ট ভালোভাবে শেষ করেছে। বিএলও, এইআরও, ইআরও, ডিইও সকলেই নির্বাচন কমিশনের অংশ এবং রাজ্য সরকারের কর্মী। কমিশনের মূল মেশিনারি তো রাজ্য সরকারের। যদি তাঁরা সঠিকভাবে তাঁদের দায়িত্ব পালন না করেন তাহলে ভুগতে হবে সাধারণ মানুষ বা ভোটারকেই। রাজ্য সরকার যদি জিরো কো-অপারেশন করে তাহলে কমিশনকে কাঠগড়ায় তুলে লাভ কি ? ” পরিশেষে অজ্ঞতা ও তা থেকে তৈরি বিভ্রান্তি সর্বোপরি রাজ্য-কমিশন দ্বন্দ্ব এসআইআর প্রক্রিয়ায় নির্বাচনী মেশিনারির ভূমিকায় প্রশ্নচিহ্ন তৈরি করছে তেমনি সাধারণ ভোটারদের হয়রানি বাড়িয়েছে। সবমিলিয়ে এসআইআর নিয়ে সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা হোমওয়ার্ক ফের প্রশ্নের মুখে ফেলছে নির্বাচন কমিশনকে।

