বৈধ ভোটারের যৌক্তিকতা খুঁজতে “অযৌক্তিক” কমিশন ?!! প্রশ্ন নির্বাচন কর্মীদের
সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়
সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩২৪, ভারতীয় জনপ্রতিনিধিত্ব আইন ১৯৫০ এবং নির্বাচক নিবন্ধীকরণ বিধি ১৯৬০ , সাংবিধানিক রীতিনীতি ও বিধিবদ্ধ এই তিনটি ফ্রেমওয়ার্কের মাধ্যমে নির্বাচন কমিশন নির্বাচনের কাজ পরিচালনা করে। বঙ্গের এসআইআর পরিচালনার ক্ষেত্রেও এই ফ্রেমওয়ার্কের মধ্যে থেকেই গাইডলাইন তৈরি করছে নির্বাচন কমিশন। উদ্ভূত পরিস্থিতি অনুযায়ী নিত্য নতুন গাইডলাইন বা ম্যানুয়াল তৈরি করতে গিয়ে খোদ নির্বাচন কমিশন এই ফ্রেমওয়ার্ক থেকে বিচ্যুত হচ্ছে বলে অভিযোগ উঠেছে। রাজ্যের এসআইআর প্রক্রিয়ায় লজিকাল ডিসক্রিপ্যান্সি বা যুক্তিগত অসঙ্গতি নিয়ে গাইডলাইন তৈরির ক্ষেত্রে কমিশন নিজেই “অযৌক্তিক” বলে অভিযোগ সাধারণ ভোটার থেকে নির্বাচনকর্মীদেরও। যার প্রতিফলনে হয়রানি বেড়েছে ভোটারদের, হতোদ্যম হয়ে পড়ছেন নির্বাচন কর্মীরা, দিন দিন বাড়ছে রাজনৈতিক উত্তেজনার পারা, দিকে দিকে ছড়িয়ে পড়ছে জনরোষের রাজনীতি এবং শাসক-কমিশন চাপানউতোর বলেও দাবি। প্রশ্ন উঠেছে,
‘ লজিকাল ডিসক্রিপ্যান্সি ‘ বা ‘ যুক্তিগত অসঙ্গতি ‘ নিয়ে কমিশন যে যুক্তি-তত্ত্ব একপ্রকার চাপিয়ে দেওয়ার চেষ্টা করছে তা কতটা যুক্তিযুক্ত ?
মূলত, রাজ্যের ভোটারদের সাতটি ক্ষেত্রে যুক্তিগত অসঙ্গতির পরীক্ষা দিতে হচ্ছে। যদি কোনও ভোটারের ৬-এর বেশি প্রজেনি থাকে যে ধরনের ভোটার সংখ্যা ২৩ লক্ষ ৬৪ হাজার ৩০ জন, ৪৫ বছরের বেশি বয়সী ভোটার যাদের সংখ্যা ১৯ লক্ষ ৩৯ হাজার ২৫০, বাবার নামের সঙ্গে মিসম্যাচ এধরনের ভোটার সংখ্যা ৮৫ লক্ষ ১ হাজার ৪৮৬ জন, বাবা-মায়ের সঙ্গে ভোটারের বয়সের পার্থক্য ১৫ বছরের কম যাদের সংখ্যা ১০ লক্ষ ৭৬ হাজার ৯৮১, বাবা-মায়ের সঙ্গে ভোটারের বয়সের পার্থক্য ৫০ বছরের বেশি এধরনের ভোটার রয়েছেন ৮ লক্ষ ৫৯ হাজার ২৭৫ জন,
৩ লক্ষ ১১ হাজার ৮১১ জন এমন ভোটার রয়েছেন যাঁদের সঙ্গে তাঁদের দাদু বা ঠাকুমার বয়সের পার্থক্য ৪০ বছরের কম এবং ভোটারের লিঙ্গ বৈষম্যের জেরে যে অসংগতি দেখা দিয়েছে সে ধরনের ভোটার সংখ্যা ১২ লক্ষ ৯৮ হাজার ৩৪০ জন।
এই বিপুল সংখ্যক মানুষের নথিপত্র যাচাইকরণ ও তাঁদের শুনানির রাজসূয় যজ্ঞ চলছে রাজ্যজুড়ে। যদিও অভিযোগ উঠেছে,
কোনও বস্তুনিষ্ঠ মানদণ্ড বা সুনির্দিষ্ট স্ট্যান্ডার্ড অপারেটিং প্রসেডিওর তৈরি না করেই এই শুনানি পদ্ধতি শুরু করা হয়েছে। পরিস্থিতি অনুযায়ী কখনও মৌখিকভাবে বহুক্ষেত্রে হোয়াটসঅ্যাপে আধিকারিকদের নিদান দেওয়া হয়েছে। কিন্তু যাদের জন্য এই যুক্তির বিচার তাঁদের জন্য পদক্ষেপ হয়নি। ফলে বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে ভোটার থেকে নির্বাচন কর্মী সকলকেই। বস্তুগত ক্ষেত্রে যৌক্তিক অসঙ্গতি কী? আইনসম্মত নিষ্পত্তির জন্য কোন স্তরের প্রমাণপত্র বা নথি উপযুক্ত তার সঠিক অনুধাবন না করেই নিত্যনতুন গাইডলাইন শুনানির কাজকে আরও বিপাকে ফেলছে বলেও অভিযোগ। পরিণতিতে জেলায় জেলায় শুনানির কাজে অসঙ্গতি যেমন বেড়েছে তেমনি নির্বাচন কর্মীদের মধ্যে বেড়েছে অনিশ্চয়তা এবং বিড়ম্বনা। তার উপর ভোট রাজনীতির আগ্রাসন তো আছেই। সবমিলিয়ে এই অনিশ্চয়তায় ভরা পদ্ধতির জেরে সব স্তরের ভোটারদের হেনস্থাও বেড়েছে সমানভাবে।
কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা ভিত্তিক বিশ্লেষণের মাধ্যমে চিহ্নিত যৌক্তিক অসঙ্গতির মূল ভিত্তি হল ২০০২ সালের চূড়ান্ত ভোটার তালিকা। ওই তালিকা থেকে সংগৃহীত অস্পষ্ট-অসম্পূর্ণ তথ্যের উপর ভিত্তি করেই শুনানির চিত্রনাট্য তৈরি। ভোটার তালিকা তৈরির সঙ্গে যুক্ত ০আধিকারিকদের মতে, উল্লিখিত ভোটার তালিকাটি এমন এক সময়ে তৈরি করা হয়েছিল যখন সম্পূর্ণ নাম রেকর্ড করা ছিল না এবং জন্ম তারিখের ডাটাবেস সংবিধিবদ্ধভাবে রেকর্ড করা হত না। অনেক ক্ষেত্রে বয়সের তালিকাটি চোখে দেখে বা অনুমানের উপর ভিত্তি করে তৈরি করা হয়েছিল। নথিভুক্ত প্রমাণ সেক্ষেত্রে গুরুত্ব পায়নি। বামফ্রন্ট জমানার সেই ভোটার তালিকার উপর ভিত্তি করে এবারের এসআইআর করতে গিয়ে
বয়সের অমিল, নামের তারতম্য এবং প্রজন্মের মধ্যে সংযোগ সম্পর্কিত অসঙ্গতিগুলি স্বাভাবিকভাবেই সামনে এসেছে। মূলত এই অসংগতির ক্ষেত্রে যতটা ভোটারের ভুল ব্যাখ্যা তার থেকেও বেশি তথ্যের অন্তর্নিহিত সীমাবদ্ধতা বলে মনে করছেন নির্বাচনকর্মীরাই। ১৯৬০ সালের ভোটার নিবন্ধন নিয়মের বিধি ২৬ অনুযায়ী বাধ্যতামূলকভাবে আইনত গ্রহণযোগ্য প্রমাণ এবং যথাযথ তদন্তের মাধ্যমে এই অসঙ্গতি দূর করা প্রয়োজন। কিন্তু যাকে ভিত্তি করে অসংগতি নির্ধারণ করার একচেটিয়া সিদ্ধান্ত নেওয়া হচ্ছে তা যেমন বাঞ্ছনীয় নয় তেমনি অযৌক্তিক এবং ১৯৫০ সালের জনপ্রতিনিধিত্ব আইনের ২১, ২২ এবং ২৩ ধারার পরিকল্পনার পরিপন্থী বলে অভিযোগ তুলেছেন নির্বাচন কর্মীরা। ইতিমধ্যেই ফর্ম ৭ জমা নিয়ে কমিশনের আইনি ব্যাখ্যায় নির্বাচক নিবন্ধীকরণ বিধির ১৪বি বিধিভঙ্গের অভিযোগ উঠেছে। পরিশেষে পরিস্থিতির বাস্তবতা বুঝে সুপ্রিম কোর্টকে হস্তক্ষেপ করতে হয়েছে। নির্বাচন কর্মীরাই প্রশ্ন তুলেছেন, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্সের মাধ্যমে তৈরি যুক্তিগুলির আইনগত ভিত্তি এবং স্বাভাবিক ন্যায়বিচারের নীতিগুলির সম্পর্কে পর্যবেক্ষণের যৌক্তিকতা নিয়েও।
সার্বিকভাবে ইআরও বা এইআরও-রা নথি যাচাইয়ের ক্ষেত্রে আধা বিচারিক (quasi judicial) সিদ্ধান্ত নিতে পারেন সেক্ষেত্রে এই ধরণের অস্বচ্ছ্ব ও অনুমান নির্ভর তথ্য-প্রযুক্তির উপর নির্ভর করা কতটা নির্ভরযোগ্য এবং যুক্তিপূর্ণ হবে ? তা নিয়ে প্রশ্ন রয়েছে আধিকারিকদের মনেই। ফলে ভোটারের বৈধতার যুক্তির খোঁজে অযৌক্তিক উপায় অবলম্বন করা হচ্ছে না তো? নির্বাচন কমিশনের কাজে উঠছে প্রশ্ন।

