বিধানসভায় সংখ্যালঘুদের “সমাজবিরোধী” বলায় বিতর্ক, বুদ্ধ-লকেটের পথে হেঁটে শাস্তির মুখে অগ্নিমিত্রা
সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়
সংখ্যালঘু মানেই কি বিভেদ ও বিদ্বেষের টার্গেট ? শাসক বা বিরোধী যেই হোক
সংখ্যালঘু সম্প্রদায় সংসদীয় রাজনীতির আবর্তে যে বরাবরই সফট টার্গেট তা শুক্রবার ফের প্রমাণ মিলল বিধানসভায়।
বিধানসভায রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য থেকে সংসদে লকেট চট্টোপাধ্যায়ের পথেই সেই নীতি অনুসরণ করে হাঁটলেন বিজেপির বিধায়ক অগ্রিমিত্রা পাল। শুক্রবার বিধানসভার অধিবেশনে বাজেট বিতর্কে অংশ নিয়ে অগ্নিমিত্রা দাবি করেন, সংখ্যালঘু উন্নয়নের নামে কোটি কোটি টাকা খরচ করে রাজ্য সরকার মূলত ” সমাজবিরোধী ” তৈরি করছে। এই মন্তব্য নিয়েই শুক্রবার রাজ্য বিধানসভা অধিবেশনে শোরগোল পড়ে যায়। ট্রেজারি বেঞ্চের বিধায়কদের পক্ষ থেকে বিজেপি বিধায়কের এই বক্তব্য খারিজ করে তার বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানানো হয়। পরিষোদীয় মন্ত্রী শোভনদেব চট্টোপাধ্যায় শাসকদলের বিধায়কদের সমর্থনসহ বিধানসভার অধ্যক্ষের কাছে অগ্নিমিত্রার বক্তব্যের পরিপ্রেক্ষিতে নিন্দা প্রস্তাব জমা দেন। পরে বিধানসভার অধ্যক্ষ বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় সেই নিন্দা প্রস্তাব পাঠ করিয়ে এই ধরনের মন্তব্য বিধানসভায় ” অনভিপ্রেত ” বলে উল্লেখ করেন এই মন্তব্যের নিন্দা করেন। যদিও শাসক দলের বিধায়করা বিজেপি বিধায়কের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবি জানাতে থাকেন। কক্ষে উপস্থিত সংখ্যালঘু বিধায়ক তথা মন্ত্রীরা বিজেপি বিধায়কের এই বক্তব্যের তীব্র নিন্দা করেন। এবং তারাও শাস্তির দাবিতে অনড় থাকেন। অধিবেশন শেষ হওয়ার পর বিধানসভার কার্যনির্বাহী কমিটির বৈঠকে ফের এই বিষয়টি উত্থাপিত হয়। শাসকদলের বিধায়ক ও মন্ত্রীরা অগ্নিমিত্রা পালের বিরুদ্ধে স্বাধিকার ভঙ্গের দাবি জানান অধ্যক্ষের কাছে। অধ্যক্ষ নিয়ম অনুসারে লিখিত আবেদন করতে বলেন। শনিবার বিধানসভার অধিবেশনে অগ্নিমিত্রার বিরুদ্ধে স্বাধিকার ভঙ্গের নোটিশ দিতে পারে ট্রেজারি বেঞ্চ। সেই আবেদনের ভিত্তিতে বিধানসভার অধ্যক্ষ কড়া পদক্ষেপ করবেন কিনা তা নিয়ে জোর চর্চা বিধানসভায়।
বস্তুত, রাজনৈতিক কৌশলগত কারণে সংসদীয় গণতন্ত্রে বারংবার সংখ্যালঘুদের ‘টার্গেট’ করা হয়েছে। রাজ্যের ভোট রাজনীতিতে সংখ্যালঘুদের সমর্থন ধীরে ধীরে মেরুকরণ হওয়ায়, কখনো শাসক কখনো বা বিরোধীদের তোপের মুখে পড়েছে সংখ্যালঘুরা। ২০০২ সালে বিধানসভার অধিবেশন কক্ষে দাঁড়িয়ে রাজ্যে জঙ্গি কার্যকলাপ সংক্রান্ত বিষয় বক্তব্য রাখতে গিয়ে খোদ তৎকালীন মুখ্যমন্ত্রী বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য নিশানা করেছিলেন সংখ্যালঘুদের। ‘রাজ্যের মাদ্রাসা গুলো সন্ত্রাসীর আঁতুড়ঘর’, বিধানসভায় দাঁড়িয়ে এমনই মন্তব্য করেছিলেন প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী। সেই মন্তব্যের জেরে রাজ্যজুড়ে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল। এমনকি বুদ্ধদেবের দল সিপিআইএম পরিষদীয় দলনেতা তথা মুখ্যমন্ত্রী বক্তব্যকে মান্যতা দেয়নি। পরবর্তী সময়ে নিজের বক্তব্য থেকে সম্পূর্ণ সরে না আসলেও বুদ্ধদেব ভট্টাচার্য এ ধরনের মন্তব্য থেকে যাতে বিরত থাকেন তা দলীয় স্তরে সিদ্ধান্তের কথা জানানো হয়। রাজ্যে রাজনৈতিক পালা বদলের পর যখন বিরোধী শক্তি হিসাবে ভারতীয় জনতা পার্টি প্রতিষ্ঠা পায় তখনো বিধানসভায় বা সংসদে একাধিকবার টার্গেট হয়েছেন সংখ্যালঘুরা। বাংলা থেকে নির্বাচিত প্রাক্তন সাংসদ লকেট চট্টোপাধ্যায় সংসদে দাঁড়িয়ে মাদ্রাসাগুলিকে বুদ্ধদেবের সুরে সুর মিলিয়ে “জেএমবি’র প্রশিক্ষণ কেন্দ্র” হিসেবে চিহ্নিত করেছিলেন। তা নিয়ে বিস্তর জলঘোলা হয়েছিল। রাজ্যের পরিষদীয় মন্ত্রী শোভনদেব চট্টোপাধ্যায়ের বক্তব্য, ” যেহেতু এরাজ্যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের সমর্থনের সিংহভাগ তৃণমূলের সঙ্গে সেই কারণে ভারতীয় জনতা পার্টি এখনও রাজনৈতিক কৌশলগতভাবে সংখ্যালঘুদের সফট টার্গেট করে চলেছে।” পাশাপাশি রাজ্যের মন্ত্রী ফিরহাদ হাকিম জানিয়েছেন, “সংখ্যালঘুরা ক্রিমিনাল নয়। তারা ভারতীয়। ” রাজ্যের অর্থমন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য নিন্দা করে বলেন, ” যারা সংবিধানের শপথ নেয় তারা এ ধরনের কথা বলতে পারেন না। ” যদিও ভারতীয় জনতা পার্টির পক্ষ থেকে এ বিষয় নিয়ে কোনও প্রতিক্রিয়া পাওয়া যায়নি। বিধানসভার অধ্যক্ষ বিমান বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছেন, ” জাতিগতভাবে বা বিদ্বেষমুলক এই ধরনের মন্তব্য নিন্দনীয়। ”

