বিশেষহেডলাইন

লক্ষ লক্ষ মানুষের ভোটাধিকার বিপন্ন !! বন্দুকের নলে শান্তি প্রতিষ্ঠায় নির্বাচনী সাফল্য মিলবে? অপেক্ষায় রাজ্যবাসী

সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়

হিংসা-ভয়ভীতি ও প্ররোচনা মুক্ত নির্বাচন, যেখানে কোনও ছাপ্পা, রিগিং অথবা বুথ জ্যাম মুক্ত অবাধ ভোটদান করতে পারবেন দেশের নাগরিকরা, এমনই স্বর্গীয় পরিবেশে নির্বাচন পরিচালনাই লক্ষ্য নির্বাচন কমিশনের। মূল শ্লোগান “কোনও যোগ্য ভোটার যেন বাদ না যায়”। আর যোগ্য ভোটারদের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতেই এরাজ্যের নির্বাচনে এই স্বর্গীয় পরিবেশ বজায় রাখতে চায় কমিশন। সেজন্য দেশের সবচেয়ে বেশি উপদ্রুত এলাকা বলে পরিচিত জম্মু-কাশ্মীর কে অনেক পিছনে ফেলে ইতিমধ্যেই দেশের নির্বাচনী ইতিহাসে সর্বাধিক বাহিনী শুধুমাত্র পশ্চিমবঙ্গের জন্য মোতায়েন করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনে নিশ্ছিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পশ্চিমবঙ্গে বন্দুকের নল, ইনসাস-এলএমজি-র বাড়বাড়ন্তই শ্রেয় বলে মনে করে নির্বাচন কমিশন। রাজ্যের সিইও-র মতে, “যত ফোর্স লাগবে তত পাওয়া যাবে, কিন্তু নির্বাচন অবাধ ও শান্তিপুর্ণ করতে হবে।”
স্বাভাবিকভাবেই ভোটের দিন ঘোষণার আগে থেকেই রাজ্যের ছবিটা ঠিক যেন
“হল্লা চলেছে যুদ্ধে”। তবে জনমনে বা প্রশাসনের অন্দরে প্রশ্ন উঠেছে, উপলক্ষ্য যদি দেশের নাগরিকদের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষা হয়, তাহলে লাগামছাড়া বন্দুকের শাসন কতটা যুক্তিযুক্ত ? ভারতীয় সংবিধান কি বন্দুকের শাসনকে প্রশ্রয় দেয় ? বন্দুকের নল শান্তি না শক্তির উৎস ? যদি শক্তির উৎস হয় তাহলে কোন শান্তির বার্তা দিতে চায় সাংবিধানিক সংস্থা নির্বাচন কমিশন? অবশ্য ভোটের আগে ও পরে অশান্তির অতীত অভিজ্ঞতা থেকেই ভয়ের পাল্টা ভয় দিয়েই কাজ হাসিল করতে চায় নির্বাচন কমিশন বলে অভিমত রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের।

তবে নির্বাচনে শান্তি বা স্থিতাবস্থা বজায় রাখার দায় কমিশনের একার নয়। রাজ্য প্রশাসন তো বটেই নির্বাচনী ব্যবস্থার অন্যতম শরিক রাজনৈতিক দল ও নির্বাচকদেরও সমানভাবে নিজেদের দায়িত্ব পালন করতে হবে বলেও বিধান দিয়েছে সংবিধান । অবশ্য পদস্থ কর্তাদের মতে, এমনিতেই নির্বাচন হল গণতন্ত্রের মোড়কে ক্ষমতা দখলের লড়াই। সেকারণে নির্বাচনী ময়দানে সমস্ত নেতা-মন্ত্রী বা রাজনৈতিক দল এমনকি প্রচারমাধ্যমও কথায় ও কাজে “ভোটযুদ্ধ” বা “ভোটের লড়াই” হিসেবেই নির্বাচনী প্রক্রিয়াকে উল্লেখ করে থাকে। তবে সংবিধান বর্ণিত নির্বাচনী বিধি গণতান্ত্রিক অধিকার রক্ষায় কঠোর বিধিবদ্ধতা ও গাফিলতি প্রমাণে শাস্তির বিধান দিলেও তাকে যুদ্ধের আবহে পরিণত করার প্রয়োজন বোধ করেনি।

তবে এবারের নির্বাচনে প্রথম থেকেই লড়াই-লড়াই আবহ শুধু রাজনৈতিক দলগুলির আচরণেই প্রকাশ পায়নি নির্বাচন কমিশনের ভূমিকাতেও তা প্রকট হয়েছে। এসআইআর নিয়ে কোনও নির্দিষ্ট নীতি বা রূপরেখা তৈরি না করে পরিস্থিতি অনুযায়ী গাইডলাইন বদলে ভোলবদল শুধু সাধারণ ভোটারদের বিপাকে ফেলেনি বরং রাজ্যের নির্বাচনী বা রাজনৈতিক পরিস্থিতিকে আরও জটিল করেছে। রাজনৈতিক দলগুলিও নিজেদের সামর্থ্য অনুযায়ী পাল্টা প্রতিরোধের রাস্তায় নেমেছে। কোথাও শক্তির নিরিখে নির্বাচনী কর্তা থেকে বিচারকদের হেনস্থাও করেছে। কমিশনের চাহিদামত ভোটের ডিউটিতে উপযুক্ত সরকারি কর্মী দিতে গড়িমসি করেছে রাজ্য।ভোটার তালিকা তৈরির কাজে গাফিলতি প্রমাণ হলেও সংশ্লিষ্ট সরকারি কর্মীকে ‘সেফগার্ড’ দেওয়া হয়েছে। আর এই টানাপোড়েনে প্রশাসনিক ব্যবস্থাও সংযুক্ত থাকায় নির্বাচনী গণতন্ত্র শুধু প্রহসন হয়েছে তাই নয় নির্বাচন নিয়ে সাংবিধানিক উদ্দেশ্যগুলি গৌণ হয়ে ক্ষমতা দখল বা প্রদর্শনটাই মুখ্য হয়েছে। আর ক্ষমতাই যদি মূল উদ্দেশ্য হয় সেখানে সংবিধান ও যাদের জন্য সংবিধান উভয়ই গৌণ হয়ে দাঁড়ায়। যত ভোট এগোচ্ছে বঙ্গে ছাব্বিশের নির্বাচনে সেই ছবিটাই স্পষ্ট হয়ে উঠেছে ।

পক্ষান্তরে, কম সময়ের মধ্যে সাংবিধানিক প্রক্রিয়ার দোহাই দিয়ে প্রশাসনিক স্তরে চাপ সৃষ্টি করে এসআইআরকে ত্বরান্বিত করা, নির্দিষ্ট নীতির ভিত্তিতে নয়, পরিস্থিতি অনুযায়ী নিয়ম তৈরি করে সেই প্রক্রিয়াকে জটিল করা যেমন মানুষের গুরুত্বকে লঘু করে তেমনি লজিকাল ডিসক্রিপ্যান্সির মত অযৌক্তিক পদ্ধতি ভোটারের সাংবিধানিক আধিকারকে যে খর্ব করে তা বলার অপেক্ষ রাখে না। পাশাপাশি মাত্রাছাড়া রাজনৈতিক অধিকার কায়েম রাখতে গিয়ে রাজ্য প্রশাসনকে অসাংবিধানিক কাঠগড়ায় ঠেলে দিয়ে নির্বাচনী স্বচ্ছ্বতাকে আরও প্রশ্নের মুখে ঠেলে দিয়েছে শাসক-বিরোধী সব পক্ষই। এই অস্বচ্ছ্বতাকে কাজে লাগিয়ে নির্বাচন কমিশনও বিশেষ সাংবিধানিক ক্ষমতা ৩১১ ধারা কাজে লাগিয়ে প্রশাসনের লাগাম ধরার চেষ্টা করেছে। আবার কমিশন ও রাজ্য প্রশাসন তথা রাজনৈতিক দলগুলির বিবাদের সুযোগে সংবিধানের ১২৪ ধারাকে হাতিয়ার করে বিশেষ ক্ষমতাবলে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় নজিরবিহীনভাবে হস্তক্ষেপ করেছে বিচারব্যবস্থা। ধাপে ধাপে সাপ্লিমেন্টারি তালিকা প্রকাশ ও ট্রাইবুনালের জটিলতায় গোটা নির্বাচনী ব্যবস্থায় নতুন করে ” হ য ব র ল ” পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। অথচ লক্ষ লক্ষ বিপন্ন ভোটারের সাংবিধানিক অধিকার সঙ্কটেই রয়ে গেছে। সব পক্ষই নিজেদের ক্ষমতা জাহির করতে গিয়ে আখেড়ে পশ্চিমবঙ্গে কমবেশি ৯০ লক্ষ ভোটার ভোটাধিকার থেকে বঞ্চিত হতে চলেছেন যা রাজ্যের নির্বাচনী মানচিত্রে মোটেই সুখকর নয়। সব পক্ষের এই ক্ষমতার লড়াই নির্বাচনী অশান্তিকে অনিবার্য করেছে তা আঁচ করেই ভোটের একমাস আগে থেকেই ভারি বুট ও বন্দুকের নল দিয়ে নির্বাচনী এলাকা নিজেদের অনুকূলে রাখতে সচেষ্ট নির্বাচন কমিশন। শক্তির উৎসকে কাজে লাগিয়ে শান্তি স্থাপনে সর্বোপরি নাগরিকেদের সাংবিধানিক অধিকার রক্ষায় কতটা উপযোগী হয় কমিশনের পরিকল্পনা এখন তারই অপেক্ষা।

Share with