আইনের “ফাঁক” রেখেই কার্যসিদ্ধি ! ফর্ম ৭ নিয়ে কমিশনের “লজিকাল ডিসক্রিপ্যান্সি” !?
সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়
এসআইআর-এর সৌজন্যে রাজ্যবাসীর কাছে লজিকাল ডিসক্রিপ্যান্সি বা যুক্তিগত অসঙ্গতির সঙ্গে এখন পরিচিত রাজ্যবাসী। এবার ভোটারের নাম বাদ দেওয়া নিয়ে একপ্রকার নির্বাচন কমিশনই যুক্তিগত অসঙ্গতি বা ডিসক্রিপ্যান্সিতে অভিযুক্ত।
আইন এবং আইনের ফাঁক। রাজ্যের চূড়ান্ত ভোটার তালিকায় বহু ভোটারের নাম থাকা বা না থাকা নিয়ে কমিশনের নিয়মেই অসঙ্গতি নিয়ে চর্চায় প্রশাসন থেকে রাজনৈতিক মহল। নির্দিষ্ট কোনও ভোটারের নাম ভোটার তালিকা থেকে বাদ দেওয়ার জন্য নির্ধারিত ফর্ম ৭-এর ব্যবহার বিধি নিয়ে নির্বাচন কমিশনের ব্যাখ্যায় অসঙ্গতির প্রশ্নই সামনে আসছে। খসড়া ভোটার তালিকা থেকে ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার জন্য একজন ব্যক্তি সর্বাপেক্ষা কতগুলো ফর্ম ৭ জমা দিতে পারেন ? গত ১৪ জানুয়ারি রাজ্যের সিইও মনোজ কুমার আগরওয়াল সরাসরি কমিশনের কাছে রাজ্যের পাঁচ মন্ত্রীর প্রতিনিধিদলের উত্থাপিত প্রশ্নের ব্যাখ্যা চেয়েছিলেন। কমিশনের বক্তব্য, এ ব্যাপারে ভারতীয় জনপ্রতিনিধিত্ব আইন, ১৯৫০ অথবা ভোটার রেজিস্ট্রেশন বিধি, ১৯৬০ সহ নির্বাচনী নিয়মে নির্দিষ্ট কোনও ব্যাখ্যা নেই। অর্থ্যাৎ, একজন ব্যক্তি ভোটার হিসেবে কতগুলো ফর্ম ৭ জমা দিতে পারবেন তা নিয়ে নির্দিষ্টভাবে আইনে কোনও উল্লেখ নেই। বঙ্গের এসআইআর-এর ক্ষেত্রেও সেই একই আইন প্রযোজ্য।
তবে ভোটার তালিকার ম্যানুয়াল অনুযায়ী সংশ্লিষ্ট ইআরও বা ইলেক্টোরাল রেজিস্ট্রেশন অফিসার ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে দায়বদ্ধ। তিনি ব্যক্তিগতভাবে প্রতিটি আবেদন খতিয়ে দেখে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেবেন। পাশাপাশি সিইও-কে লেখা আইনি ব্যাখ্যায় কমিশন জানিয়েছে এক ব্যক্তি বা ভোটার যদি পাঁচজন বা তার বেশি ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার আবেদন জানান ( অর্থাৎ পাঁচটি বা তার বেশি ফর্ম ৭ পুরন করেন) সেক্ষেত্রে বিষয়টি পুঙ্খানুপুঙ্খভাবে খতিয়ে দেখে সংশ্লিষ্ট ভোটারের নাম বাদ দেওয়ার বিষয়টিতে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নিতে হবে ইআরও-কে। অর্থাৎ আইনে সরাসরি কিছু উল্লেখ না থাকলেও কমিশনের ব্যাখ্যা অনুযায়ী একজন ব্যক্তি চারটি ফর্ম ৭ পূরণ করতে পারবেন যেক্ষেত্রে ইআরও
‘ পার্সোনাল ইন্টারপ্রিটেশন ‘ অথবা ব্যক্তিগত মনোভাব ব্যাখ্যা করে এই আবেদনগুলিকে মান্যতা দিতে পারেন। শুধুমাত্র একজন সাধারণ নাগরিক বা ভোটারের জন্যই নয় নির্দিষ্ট রাজনৈতিক দলের এজেন্ট হিসেবে একজন বিএলএ-২ বা বুথ লেভেল এজেন্ট-২ এর ক্ষেত্রেও কমিশনের ব্যাখ্যা একই। যদিও কমিশনের পূর্ববর্তী বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী একজন বিএলএ-২ এধরনের ১০টি ফর্ম জমা দিতে পারেন। তবে সিইও-কে গতকাল দেওয়া আইনি ব্যাখ্যায় কমিশন জানিয়েছে একটি বিধানসভায় কত ভোটার রয়েছেন তার উপর একজন বিএলএ-র এই ভূমিকা নির্ভর করে। হাতে লিখেই হোক বা অনলাইন যেভাবেই ফর্ম পুরণ করা হোক না কেন সাধারণ ব্যক্তি বা ভোটার অথবা বিএলএ দু’ক্ষেত্রেই ফর্ম ৭ পূরণ নিয়ে নির্বাচনী নিয়মের এই ব্যাখ্যাই জানিয়েছে কমিশন।অথচ কমিশনের এই ব্যাখ্যা ভোটার রেজিস্ট্রেশন বিধি, ১৯৬০-এর বিধি ১৪ কে অমান্য করছে বলে কমিশনের অভ্যন্তরেই প্রশ্ন উঠেছে। সেক্ষেত্রে নির্বাচনী বিধি অনুযায়ী যুক্তিগত অসঙ্গতির অভিযোগ তোলা হচ্ছে নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধেই।
স্বাভাবিকভাবেই নির্বাচন কমিশনের এই ব্যাখ্যা নিয়ে ফের জলঘোলা শুরু হয়েছে প্রশাসন ও রাজনৈতিক স্তরে। ইতিমধ্যেই ফর্ম ৭ ইস্যুতে শনিবারও সিইও-র দ্বারস্থ হয়েছিলেন রাজ্যের মন্ত্রী ও শাসকদলের সাংসদরা। রাজ্যের মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্য জানিয়েছেন, “একজন নাগরিকের গণতান্ত্রিক তথা সাংবিধানিক আধিকারকে যেভাবে একজন ব্যক্তির ইচ্ছা-অনিচ্ছার উপর নির্ভর করছে তা ভারতীয় সংবিধানের ঐতিহ্য বিরোধী। আসলে কমিশন ভোটারদের সাংবিধানিক আধিকার রক্ষায় আগ্রহী নয়, নিজেদের এজেন্ডা রূপায়নেই সচেষ্ট। যেনতেন প্রকারেণ রাজনৈতিক এজেন্ডা অনুযায়ী যোগ্য ভোটারের নাম বাদ দেওয়াই মূল উদ্দেশ্য। সেখানে আইনের তোয়াক্কার প্রয়োজন নেই।” পাশাপাশি রাজ্য সরকারের কর্মী ( এসআইআর পর্বে ডেপুটেশনে নির্বাচন কমিশনের কর্মী) ইআরও-কে ঢাল করেই এই বিতর্কে বৈতরণী পার করতে চায় কমিশন বলেও সরব হয়েছে শাসকদল।
ইতিমধ্যেই রাজ্যে খসড়া ভোটার তালিকায় নাম তোলা, নাম বাদ দেওয়া অথবা তথ্য সংশোধনের জন্য যথাক্রমে ফর্ম ৬, ৭ এবং ৮ জমা দেওয়ার সময়সীমা বাড়ানো হয়েছে। ১৫ জানুয়ারি থেকে বাড়িয়ে ১৯ জানুয়ারি করা হয়েছে। সম্প্রতি রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে ফর্ম ৭ বোঝাই ট্রাক আটক হওয়ার ঘটনাকে সামনে রেখে দুদিন অগেই সিইও-র দ্বারস্থ হয়েছিলেন রাজ্যের পাঁচ মন্ত্রী। তাঁদের সঙ্গে বৈঠক চলাকালীন প্রসঙ্গক্রমে সিইও ফর্ম ৭ সংক্রান্ত বিষয়গুলি নিয়ে সরাসরি নির্বাচন কমিশনের দৃষ্টি আকর্ষণ করেন। বস্তুত, সিইও-র মাধ্যমে রাজ্যের শাসকদলকে ফর্ম ৭ নিয়ে এই আইনি ব্যাখ্যাই দিয়েছেন নির্বাচন কমিশনের আন্ডার সেক্রেটারি শক্তি শর্মা।

