বিশ্বাস-অবিশ্বাস দোলায় ‘মেরুকরণ’ তকমা এড়িয়ে স্বচ্ছ্বতা পরীক্ষা চূড়ান্ত ভোটার তালিকার, শনিবাসরীয় ক্লাইম্যাক্স
সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়
ধর্মীয় বিভাজন বা সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের ভিত্তিতে রাজ্যের ভোটার তালিকা তৈরি করা হচ্ছে। রাজ্যে এসআইআর পর্বের শুরু থেকেই এই অভিযোগে সরব রাজ্যের রাজনৈতিক দলগুলি। অভিযোগ পাল্টা অভিযোগ, ক্ষোভ-বিক্ষোভ চরমে ওঠে ভোটার তালিকার স্বচ্ছতা, নিরপেক্ষতা এবং নির্বাচন কমিশনের ভুমিকা নিয়েও।
সবচেয়ে বেশি চর্চা হয়েছে ভোটার তালিকায় বিশেষ একটি সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের নাম থাকা বা না থাকা নিয়ে। বাংলাদেশী বা অনুপ্রবেশকারী অথবা রোহিঙ্গা তকমা দিয়ে ভোটার তালিকা “সাফা ” করার যেমন দাবি উঠেছে তেমনি একটি নির্দিষ্ট সম্প্রদায়কে টার্গেট করে ধর্মীয় বিভাজন তৈরির মনোভাব নিয়ে ভোটার তালিকা তৈরির অভিযোগে সরব হয়েছে অপরপক্ষ। মূলত, লজিকাল ডিসক্রিপ্যান্সি ও আনম্যাপড ক্যটেগরির নামে কাদের সাপ্লিমেন্টারি তালিকায় অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বা তাঁদের পরিচয় নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে কমিশনের অন্দরেই । রাজনীতির ময়দানে বা জনসভায় যে ধর্মীয় বা সাম্প্রদায়িক মেরুকরণের কথা শুনে সাধারণ মানুষ অভ্যস্ত, সেই মেরুকরণের প্রভাব কি এবারের ভোটার তালিকাতেও ?! অধীর আগ্রহে আশা-আশঙ্কার দোলাচলে তারই অপেক্ষায় এখন রাজ্যবাসী।
অবশ্য বেশ কিছু প্রশাসনিক কর্তা থেকে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞ অথবা সমাজতাত্ত্বিকরা কিন্তু এই ভাবনাকে গুরুত্ব দিতে নারাজ। ‘ যাঁরা যত বেশি বিপন্ন তাঁরাই তত বেশি সচেতন ‘ এই বুনিয়াদি অভিজ্ঞতাকে ঢাল করেই তাঁদের বক্তব্য, ” জীবনধারণ থেকে আশ্রয়ের অনিশ্চয়তা , প্রশাসনিক হেনস্থা থেকে রেহাই পেতে এধরনের মানুষ সবসময় তাঁদের প্রামাণ্য নথি ঠিক রাখে এবং ঝড়-ঝাপটা, বিপর্যয়েও তা আঁকড়ে রাখে। ফলে নথির অভাবে তাঁদের নাম বাদ দেওয়া যথেষ্ট ঝুঁকিপূর্ণ। ” সাংবিধানিক দৃষ্টিকোণ থেকে নির্বাচন কমিশন এধরনের অনিয়মকে প্রশ্রয় দেবে না বলেই তাঁদের মত।
গত লোকসভা নির্বাচনের মুখে উত্তরবঙ্গের বন্যাপীড়িত আশ্রয়হীন ভোটারদের ঘটনা এই যুক্তির সমর্থন যোগায়।
বরং সমাজতাত্ত্বিকদের মতে, ” যাঁরা নিশ্চিন্তে জীবনযাপন করেন তাঁদের ক্ষেত্রেই নথি বিভ্রাটের সম্ভাবনা বেশি। ” রাজ্যে এসআইআর পর্বেও এই
যুক্তি অমূলক নয় বলেও মনে করছেন পদস্থরাও। বিরুদ্ধ মত অনুযায়ী,
” নীতি-আদর্শ যেখানে গৌণ সেখানে প্রচলিত বিশ্বাস বা ধ্যান-ধারণা মূল্যহীন।”
রাজ্যে নিযুক্ত বিশেষ রোল অবজার্ভার সুব্রত গুপ্ত’র কথায় ” বিশ্বাসের বাতাবরণেই এসআইআর পর্ব শুরু হয়েছিল। বিএলও-রা কোনও প্রমাণ বা নথি ছাড়াই ভোটারদের থেকে এনুমারেশন ফর্ম সংগ্রহ করে ইআরও নেট-এ আপলোড করেছিলেন। কিন্তু দেখা গেছে সেই বিশ্বাসভঙ্গ করেছেন এক শ্রেণীর ভোটাররাই। সেখান থেকেই লজিকাল ডিসক্রিপ্যান্সি বা যুক্তিগ্রাহ্য অসঙ্গতির সৃষ্টি। কার্যক্ষেত্রে ভোটাররাই নিজেদের স্বপক্ষে প্রমাণ দেখাতে পরেননি।” নির্বচনী কর্তাদের বক্তব্য, ধর্ম-বর্ণ সম্প্রদায় বা বিশেষ কোনও সমীকরণের ভিত্তিতে ভোটার তালিকা তৈরি শুধু সংবিধান বিরোধী নয় নির্বাচন কমিশনের ঐতিহ্য বিরোধী। ভারতীয় জনপ্রতিনিধিত্ব আইন ১৯৫০ এবং ১৯৫১ অথবা নির্বাচক নিবন্ধীকরণ বিধি ১৯৬০, যে সাংবিধানিক বিধিবদ্ধতার ফ্রেমওয়ার্কে নির্বাচন কমিশন কাজ করে সেখানে এ ধরনের কোন সমীকরণের বাস্তবতা নেই। সিইও-র বক্তব্য, ” শুধুমাত্র ভোটার হওয়ার যোগ্যতার প্রমাণ সাপেক্ষে বিশ্বের বৃহত্তম নির্বাচনী গণতন্ত্রের শরিক হতে পারেন একজন ভারতীয় নাগরিক। সেখানে মেরুকরণ-সমীকরণ এই বিষয়গুলি অবান্তর। ”
ইতিমধ্যেই খসড়া ভোটার তালিকায় ৫৮ লক্ষের কিছু বেশি ভোটারের নাম বাদ যাওয়ায় রাজ্যে ভোটার সংখ্যা কমে দাঁড়িয়েছে ৭ কোটি ৮ লক্ষের কাছাকাছি। ভোটাধিকারের দোলাচলে রয়েছে আরও ৬০ লক্ষ। পাশাপাশি শুনানিতে গরহাজিরা, অযোগ্য ভোটার, ফর্ম ৭ জমার কারণে তালিকা থেকে নাম বাদ এবং ফর্ম ৬ মাধ্যমে নাম সংযোজন প্রক্রিয়ায় শনিবাসরীয় ক্লাইম্যাক্সে চুড়ান্ত তালিকায় কত নাম বাদ পড়বে তা নিয়েই উৎকণ্ঠা চরমে।

