বিশেষহেডলাইন

ডেডলাইন পেরোলেও ফর্ম ৭ অনুমোদনে ‘ধীরে চলো’!! স্বচ্ছ্ব ভোটার তালিকা নিয়ে সংশয়

ডেডলাইন পেরোলেও ফর্ম ৭ অনুমোদনে ‘ ধীরে চলো ‘ !! স্বচ্ছ্ব ভোটার তালিকা নিয়ে সংশয়

সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়

ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার জন্য ব্যবহৃত ফর্ম ৭-এর নিষ্পত্তি বা অনুমোদন নিয়েও তৈরি হয়েছে জটিলতা। যদিও ডেডলাইন পেরোলেও কত ফর্ম ৭ নিষ্পত্তি হয়েছে তার নির্দিষ্ট কোনও তথ্য পাওয়া যায়নি রাজ্যের সিইও দপ্তর থেকে। প্রথমে ১৫ জানুয়ারি এবং পরে তা বর্ধিত হয়ে ১৪ ফেব্রুয়ারি রাজ্যে ফর্ম ৭ জমা দেওয়ার মেয়াদ শেষ হলেও এখনও পর্যন্ত তা নিষ্পত্তি বা অনুমোদনের কাজে গড়িমসি লক্ষ্য করা গেছে। সরকারি কর্মীদের মতে একসঙ্গে নানাবিধ কাজের চাপ, এক এক সময় নির্বাচন কমিশনের এক এক রকম গাইডলাইন এবং নির্দিষ্ট পরিকল্পনা ছাড়া ভোটার তালিকা তৈরির কাজ পরিচালনা করতে গিয়ে ফর্ম ৭ নিষ্পত্তির কাজে দেরি হয়েছে। যদিও কমিশনের পদস্থ আধিকারিকদের মতে ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ দেওয়ার ক্ষেত্রে বরাবরই দীর্ঘসূত্রিতা লক্ষ্য করা যায়। ফর্ম ৬ বা ভোটার তালিকায় নাম তোলার আবেদনপত্র নিষ্পত্তির ক্ষেত্রে যতটা তৎপরতা দেখা যায় ফর্ম ৭ নিষ্পত্তিতে ছবিটা ততটাই উল্টো। ফর্ম ৬ এর ক্ষেত্রে সংখ্যা যত কমেছে ফর্ম ৭ ততই পাল্লা দিয়ে বছর বছর বেড়েছে। অর্থাৎ আগের বছরের সঙ্গে চলতি বছরের সংখ্যায় ওভারল্যাপিং স্পষ্ট হয়েছে। নির্বাচন কর্মীদের দীর্ঘসুত্রিতার কারণেই এই ওভারল্যাপিং বলে মনে করছেন পদস্থ আধিকারিকরা। তবে কি স্থানীয় প্রশাসন ভোটার তালিকা নির্ভুল করার কাজে ‘ ধীরে চলো ‘ নীতি নিয়েছে ?

এসআইআর পর্বে খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশের পর রাজ্যে ফর্ম ৭ বা বিভিন্ন কারণে ভোটার তালিকা থেকে ভোটারদের নাম বাদ যাওয়ার আবেদন জমা পড়েছে ৪২ হাজার ৫০১টি।
গত ১০ বছরের পরিসংখ্যান বিশ্লেষণ করলে দেখা যাচ্ছে রাজ্যে রাজনৈতিক পালাবদলের পর একটা দীর্ঘ সময় যখন রাজ্যে বিরোধী রাজনীতিতে ক্রাইসিস ছিল তখন ফর্ম ৭ এর সংখ্যা লক্ষের ঘরে পৌঁছয়নি। এমনকি ২০১৪ লোকসভা নির্বাচনে কেন্দ্রে নরেন্দ্র মোদির সরকার এলেও রাজ্যে ভোটার তালিকা থেকে নাম বিয়োজনের বিষয়টি পরবর্তী বছরগুলিতে সেভাবে দানা বাঁধেনি। ২০১৪ সালে রাজ্যে ফর্ম ৭ জমা পড়েছিল ৮৬ হাজার ৯৬৩টি। পরবর্তী দুই বছরে অর্থাৎ ২০১৫ এবং ২০১৬ সালে সেই সংখ্যা দাঁড়ায় যথাক্রমে ৪৭ হাজার ২৯ এবং ৬৩ হাজার ৯৬৫। এমনকি ২০১৭ এবং ২০১৮ সালে সেই সংখ্যা কমে দাঁড়ায় যথাক্রমে ২৬ হাজার ৬১৮ এবং ২০ হাজার ২৩৯। এরপরই আচমকা উর্ধ্বমুখী হয় ফর্ম ৭ জমার সংখ্যা। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের বছর, যে বছরে লোকসভায় এই রাজ্য থেকে বিজেপির আসন সংখ্যা দুই থেকে বেড়ে ১৮ হয়েছিল, রাজ্যে ফর্ম ৭ জমার সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১ লক্ষ ৫৩ হাজার ৮০৭। এরপর ফিবছর ফর্ম ৭ জমার সংখ্যা লক্ষাধিক হয়েছে। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনী বছরে ফর্ম ৭ জমা পড়েছিল ৬ লক্ষ ১৯ হাজার ৪৭১ যা ২০২৩ সালে বেড়ে দাঁড়ায় ৭ লক্ষ ৪০ হাজারের বেশি। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ১০ লক্ষ ৫ হাজার ৮৭৯। গত বছর অর্থাৎ ২০২৫ সালে ফর্ম ৭ জমা পড়ে ৬ লক্ষ ৩০ হাজার ৫৮৩। চলতি ২০২৬ সালে
এসআইআর প্রাথমিক পর্ব বা এনুমারেশন পর্ব শেষে ৫৮ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ পড়ার পর গত দশ বছরের মধ্যে সবচেয়ে কম সংখ্যায় ফর্ম ৭ জমা পড়লেও তার নিষ্পত্তি নিয়েও টালবাহানা অব্যাহত।

চলতি বছরের এসআইআর পর্বের শুরু থেকেই ফর্ম ৭ বা ভুয়ো ভোটারের নাম বাদের জন্য যাতে উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হয় তা নিয়ে সরব হয়েছিল বিরোধীপক্ষ। একদিকে সক্রিয় নির্বাচন কমিশন অন্যদিকে বিরোধীপক্ষের লাগাতার চাপ সত্বেও ফর্ম ৭ নিষ্পত্তি বা অনুমোদনের ক্ষেত্রে একাধিকবার রিমাইন্ডার দিতে হয়েছে নির্বাচন কমিশনকে। অবশেষে, ১৬ ফেব্রুয়ারি ডেডলাইন দিয়ে রাজ্যের সিইও দপ্তর এবং জেলাগুলিতে পড়ে থাকা ফর্ম ৭ দ্রুত নিষ্পত্তি করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে নির্বাচন কমিশনের পক্ষ থেকে। সবমিলিয়ে কমিশনের অপরিকল্পিত চিন্তাভাবনাই হোক বা
নির্বাচন কর্মীদের কাজে দীর্ঘসুত্রিতার নিরিখে আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি রাজ্যে যে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশিত হতে চলেছে সেখানে স্বচ্ছ ও নির্ভুল ভোটার তালিকার প্রকাশ যে কার্যত ‘ সোনার পাথরবাটি ‘ হতে চলেছে বলেই মনে করছে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক মহল।

Share with