‘ধনী’ কলকাতায় ‘গরিব’ বাঙালি !! ভোটবাজারে ‘তোফা’ হবে এই তথ্য ?!
সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়
কলকাতার মাথায় নতুন পালক। জিডিপি বা আর্থিক বৃদ্ধির নিরিখে বেঙ্গালুরু, হায়দরাবাদ , চেন্নাই, আহমেদাবাদকে পিছনে ফেলে দেশের তৃতীয় বৃহত্তম শহর কলকাতা মহানগরী।
সাম্প্রতিক সমীক্ষায় এই তথ্য পাওয়া গেছে। দেশের বাণিজ্য নগরী মুম্বই ও রাজধানী দিল্লির ঠিক পিছনেই। আপাতদৃষ্টিতে কলকাতার এই সাফল্যকে ভোটমুখী পশ্চিমবঙ্গে রাজনীতির ‘ তোফা ‘ মনে করা হলেও এই সাফল্য কিছুটা হলেও ‘ অশ্বথমা হত ইতি গজ ‘ -এর নামান্তর।
তথ্যপ্রযুক্তিতে দেশের সুপার পাওয়ার বেঙ্গালুরু ও হায়দরাবাদের জিডিপি যথাক্রমে ৮৩ বিলিয়ন মার্কিন ডলার ও ৭৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার সেখানে কলকাতার জিডিপি ১৫০ বিলিয়ন মার্কিন ডলার। প্রথম দুইয়ে যথাক্রমে মুম্বই (২০৯ বিলিয়ন ডলার) এবং দিল্লি এনসিআর (১৬৭ বিলিয়ন মার্কিন ডলার)। এই তথ্যে ‘৫৬ ইঞ্চির’ আহমেদাবাদকে টেক্কা দিয়ে অনেক এগিয়ে ‘ আটপৌরে ‘ কলকাতা। কিন্তু প্রশ্ন উঠেছে, এই ধনবান কলকাতায় ধনী বাঙালির সংখ্যা কত ? এক কথায় বলতে গেলে আতস কাঁচ দিয়ে কলকাতায় ধনী বাঙালিকে খুঁজতে হবে। কলকাতায় প্রথম ২৫ জনের ধনী বাঙালির তালিকায় স্থান মাত্র দু’জনের। বন্ধন ব্যাংকের স্রষ্টা চন্দ্রশেখর ঘোষ এবং পিসিজি গ্রুপের কর্ণধার পূর্ণেন্দু চট্টোপাধ্যায়। কলকাতায় সবচেয়ে বেশি ধনী ব্যক্তির নাম বেণু গোপাল বাঙুর। এই তালিকা প্রথম সারিতে রয়েছেন সঞ্জীব গোয়েঙ্কা, রাকেশ গাংগোয়াল, রাধেশ্যাম আগরওয়াল, প্রকাশ লোহিয়া, হর্ষ লোধা, বিবেক গুপ্তা প্রমুখ। প্রথম ৩০ জনের মধ্যে মেরেকেটে চন্দ্রশেখর ঘোষ, পূর্ণেন্দু চট্টোপাধ্যয়ের সঙ্গে জায়গা পেতে পারেন পতাকা বিড়ির কর্ণধার মোস্তাক হোসেন। বাঙালির গর্ব তিলোত্তমা কলকাতায় ব্যবসায়ী বাঙালির এই দৈন্যতা কি ভোট বাজারে আদৌ সামনে আসবে ? যে বাংলা ব্রিটিশ ভারতে রেনেসাঁ বা নবজাগরণের পথপ্রদর্শক, যে বাঙালির ভাবনা গোটা দেশকে ভাবতে শেখায় বলে আমরা গর্ব করি, আচার্য প্রফুল্ল চন্দ্র রায়ের আদর্শে অনুপ্রাণিত সেই বাঙালির এহেন দৈন্যদশা অখেড়ে বাংলার আর্থ-সামাজিক ও কৃষ্টি-সংস্কৃতির প্রকৃত উন্নয়ন নিয়ে ভোটের বাজারেও নতুন করে চর্চার বিষয় হয়ে উঠেছে।
বস্তুত, অর্থনৈতিক শক্তির সংখ্যাতত্ত্বে কলকাতা বর্তমানে দেশের অন্যান্য মেট্রোপলিটন শহরগুলির তুলনায় যথেষ্ট শক্তিশালী হলেও এই উপলব্ধি যে সবসময় বাস্তবতাকে প্রতিফলিত করে না সেটাও বলা প্রয়োজন। আপাতদৃষ্টিতে কলকাতার এই সাফল্য শুধু একটি পরিসংখ্যান নয়, এটি একটি শক্তিশালী অর্থনৈতিক, দ্রুত বর্ধনশীল
ও বৈচিত্র্যময় শিল্প ভিত্তি তা বলাই যায়। পক্ষান্তরে এই সাফল্যকে ভিন্ন দৃষ্টিতে দেখছেন
সমাজতাত্ত্বিক থেকে রাজনৈতিক বিশেষজ্ঞরা। তাঁদের বক্তব্য, ২০১১ সালের জনগণনাতেই স্পষ্ট হয়েছিল যে ‘দামি’ কলকাতায় ব্রাত্য হয়েছে ‘ছাপোষা’ মধ্যবিত্ত। পরবর্তীকালে পূর্ব ও পূর্বোত্তর ভারতের আর্থিক রাজধানী হিসেবে আর্থিক কর্মকাণ্ডের ভিত্তিতে কলকাতা যত ‘ দামি ‘ হয়েছে ততই আর্থিক প্রতিযোগিতায় ক্রমান্বয়ে পিছিয়ে পড়েছে বাংলার ধারক-বাহক সচেতন বাঙালি সমাজ। সেই শূন্যস্থান পুরণ করেছে ভিনরাজ্যের ব্যবসায়ী মহল। বাংলা ও বাঙালির আর্থ-সামাজিক অবস্থান , শিক্ষার অবমূল্যায়ন, রাজ্য প্রশাসনের সার্বিক আর্থ-সামাজিক নীতি এব্যপারে যেমন দায়ী সর্বোপরি ” কর্মবিমুখ ” বাঙালির মানসিকতাও
বাংলার এই অধোগতির অন্যতম কারণ বলে মনে করা হচ্ছে। অথচ সুসংহত উপায়ে স্থানিক উন্নয়ন বা সাংস্কৃতিক উন্নয়নের বদলে যেভাবে কর্পোরেট উন্নয়ন প্রাধান্য পাচ্ছে তাতেই সমস্যা বাড়ছে বলে অভিমত। বাংলার মূল কৃষ্টি-সংস্কৃতির অবক্ষয়ের পাশাপাশি বাঙালি জাতির অবনমনকেও নিশ্চিত করেছে। তা সে ফুটবল-ক্রিকেট বা সার্বিক ক্রীড়াক্ষেত্র অথবা শিক্ষাক্ষেত্রেই শুধু নয়, আর্থিক বা শিল্পক্ষেত্রেও দৈন্য হয়েছে দিন দিন। তারই প্রতিফলন এই সাম্প্রতিক সমীক্ষায় ধরা পড়েছে বলে মনে করা হচ্ছে।
তবে কর্পোরেট নিয়ন্ত্রণাধীন ভোট প্রচারে বাংলা তথা বাঙালির অধোগতির বিষয়ে কতটা সুবিচার দিতে পারবে তা নিয়ে সংশয় রয়েছেই। এই পরিস্থিতিতে ভোটের বাজারে এসআইআর-এর মতই বর্তমান বাঙালির এসআইআর কতটা প্রয়োজন তার যৌক্তিকতা নিয়েও চর্চা চলছে।

