বিশেষ

দুর্গাপুজোর সম্পর্ক না থাকলেও বাঙালি জীবনের অন্যতম দিন

বিশেষ বিশেষ দিনকে সামনে রেখে অনেকেই শুভেচ্ছা জানান। দুর্গাপুজোর আগে আজ মহালয়া। সেই মহোদয়কে কেন্দ্র করে অনেকেই ‘শুভ মহালয়া’ বা ‘মহালয়ার শুভেচ্ছা’ জানান। কিন্তু এই দিনটা সত্যিই শুভ নাকি শুভেচ্ছা জানানোর দিন? এই প্রশ্ন ঘুরপাক খায় আপামর বাঙালির মনে। আসলে মহালয়ার দিন কখনই ‘শুভ’ নয়। ‌ কিন্তু কেন? দুর্গাপুজোর সঙ্গে মহালয়ার কোনো সম্পর্ক রয়েছে? এটা নিয়েই আজ একটা মোটামুটি স্পষ্ট ধারণা দেওয়ার চেষ্টা করবে ‘আরো খবর’। প্রথমেই আসা যাক মহালয়ার সঙ্গে দুর্গা পূজোর কোনো সম্পর্ক সত্যিই রয়েছে কিনা, সে বিষয়ে। “মহালয়ার সঙ্গে কখনোই দুর্গাপুজোর কোন সম্পর্ক নেই। রেডিও’র মহিষাসুরমর্দিনীতে বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্রর অসাধারণ চণ্ডীপাঠ মহালয়ার দিন ধরে শুনে আসছি অনেকগুলো বছর ধরে। বাঙালির জীবনে ওতপ্রোতভাবে এটা জড়িয়ে গেছে। আর আমরা মনে করি ওখান থেকেই দুর্গাপুজো শুরু হয়ে গেছে” জানালেন বিশিষ্ট পুরাণ বিশেষজ্ঞ নৃসিংহ প্রসাদ ভাদুরি। তিনি আরো জানালেন,”মহালয়া হচ্ছে পিতৃপক্ষের অবসান। ‌ পুরান বলছে, পিতৃপুরুষ বা মাতৃপুরুষ তারা অন্তরীক্ষ থেকে অনেকটা নিচে নেমে আসেন। পরবর্তী পুরুষ বা বর্তমান যারা সেই বংশের মানুষজন রয়েছেন তারা পূর্ববর্তী পুরুষদের সন্তুষ্ট করার জন্য তিল- জল সহকারে তর্পণ করেন। এটাই আসলে মহালয়ার তাৎপর্য।” এখানে মনে রাখতে হবে, সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনের খাওয়া-দাওয়ার সঙ্গে পূর্বপুরুষদের দৈনন্দিন চিন্তাভাবনা এক নয়। যারা পরলোকগমন গমন করেছেন, তাদের একদিন হয় এক বছরে। সেই কারণে মহালয়ার দিন তর্পণ করে তুষ্ট করা হয়। আমাবস্যা থাকাকালীন গঙ্গার তীরবর্তী অঞ্চলে অথবা জলাশয় বা মন্দিরে দর্পণ করেন বহু মানুষ। ‌ এটা হিন্দু ধর্মের অন্যতম স্বাভাবিক প্রক্রিয়া। ‌ কিন্তু প্রশ্ন হল মহালয়া কি সত্যিই শুভ? বিশিষ্ট তন্ত্র ধারক ধ্যান যোগী আচার্য কৌটিল্য আরো খবর কে জানিয়েছেন,”এটা আমাদের পূর্বপুরুষদের স্মরণের দিন। ‌ স্বভাবতই এটা কখনোই শুভ নয়। যারা মারা গিয়েছেন তাদের প্রতি শ্রদ্ধা জ্ঞাপনের দিন। এটা কখনো শুভ হতে পারে না। ‌ বা এর কোন শুভেচ্ছা জানানোর সমর্থন সিদ্ধ নয়”। নৃসিংহপ্রসাদ ভাদুড়ীর মতে এই দিনটি উদযাপনের জন্য নয়। “একটা বিরহের তিথিকে সেলিব্রেশানে নিয়ে গিয়েছি” মহালয়া সম্পর্কে সাফ জানিয়ে দিয়েছেন বিশিষ্ট পুরান বিশেষজ্ঞ। কুরুক্ষেত্রের যুদ্ধে কর্ণ অর্জুনের বানে মারা গেলেন। এরপর তিনি স্বর্গে গমন করলেন। ‌ সেখানে থেকে রাজকীয় অভ্যর্থনা জানানো হলো। এবং খেতে দেওয়া হল। ‌ কর্ণ খেতে গিয়ে দেখলেন, সেখানে খাবার কিছু নেই। ‌ পানীয় কিছু নেই। ‌ শুধু সোনা রুপো হিরে এই ধরনের বস্তু রয়েছে। কোন প্রশ্ন করলেন এগুলো কিভাবে খাবেন তিনি? দেবলোকের উত্তর ছিল, কর্ণ সারা জীবন ব্রাহ্মণদের সোনা রুপো হিরে দান করে এসেছেন। তিনি কখনোই অন্ন দান করেননি। ‌ এমনকি পিতৃ পক্ষের উদ্দেশ্যে কখনো তর্পণ করেননি। কর্ণ পাল্টা বললেন, তার মা-বাবাকে সেটাই তিনি জানেন না তর্পণ করবেন কি করে? তখন দেবলোক থেকে কর্ণকে ‘বিশেষ অনুমতি’ দেওয়া হয়। তিনি আবার ভূলোকে আসবেন এবং ১৫ দিন তর্পণ করবেন। কর্ণ তাই করেছিলেন। ‌ পরবর্তী সময় যখন তিনি স্বর্গে গেলেন, তখন কিন্তু তিনি প্রকৃত খাবার পানীয় পেয়েছিলেন। অর্থাৎ শাস্ত্রমতে তর্পনের দিন অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। কিন্তু মহালয়া কখনোই শুভ নয়। ‌ আর মহালয়া সঙ্গে দুর্গা পূজোর কোনো সম্পর্ক নেই। এ সম্পর্ক শুধুই বাঙালির আবেগের। আর সেই আবেগ মিশিয়েছেন, বীরেন্দ্রকৃষ্ণ ভদ্র। কালজয়ী মহিষাসুরমর্দিনীতে তার অসাধারণ চন্ডী পাঠের জন্য। যতই শাস্ত্র কথা থাকুক, আপামর বাঙালি মন থেকে বিশ্বাস করে মহালয়া থেকেই দূর্গা পূজার শুরু। ‌

 

Share with