দুঃসময় উত্তরণে জাগরূক হোক ‘দশপ্রহরণধারিণী’
সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়
“সর্বেষণ মঙ্গলম ভূয়াৎ” — সকলের মঙ্গল হোক, এই প্রার্থনা বা ধর্মীয় উদ্দেশ্যেই দেবী শক্তির আরাধনা।
শাস্ত্রমতে, দুঃসময় থেকে যিনি উত্তরণ ঘটান তিনিই দূর্গা। দুঃ অর্থাৎ খারাপ, গম অর্থাৎ গমন করা। খল প্রত্যয়ে স্ত্রীলিঙ্গ হওয়ায় আ প্রত্যয় যোগ করে দূর্গা। তিনিই শক্তি, তিনিই মহামায়া আবার তিনিই আনন্দের প্রতীক। কল্যাণকামী শক্তির জাগরণে তিনিই পুরোধা শক্তি।
সামাজিক-আর্থিক ও জীবনধারণের নানাবিধ সমস্যা থেকে মুক্তিলাভের আশা ও বিশ্বাস থেকেই দূর্গাপুজোর প্রচলন। দূর্গার সঙ্গে “দশ” শব্দটাও ওতপ্রোতভাবে জড়িত। তিনি দশভূজা– প্রতিটি হাত এক একটি শক্তির আধার। তিনি দশমহাবিদ্যা– দশ মাঙ্গলিক রূপে আবির্ভূতা। তিনি দশমৃত্তিকা — সমাজের অন্ত্যজ শ্রেণীর বাড়ির মাটিতেই তাঁর অভিষেক। তিনি দশপ্রহরণধারিণী– দশ প্রসারণের দ্বারা তিনিই দশের রক্ষাকর্তা, দশের মঙ্গলের জন্যই আরাধ্যা। দশাবতার এই শক্তি আরাধনার অঙ্গ। আসলে, অসুর আমাদের ভিতরের ষড়রিপুর আস্ফালন। দশ হাতের অস্ত্রে সেই আস্ফালনকে সংযত করার জন্যই দূর্গার আবির্ভাব– একথা ন্যায়শাস্ত্রেও বর্ণিত।
দুর্গার দশ হাতে দশ অস্ত্রেরও দশ মাহাত্ম্য । ত্রিশূল হল সত্ত্ব , তমঃ ও রজঃ এই তিন গুণের প্রতীক, চক্র হলো পৃথিবীর প্রতীক, পদ্ম বিকাশের প্রতীক, শঙ্খ হল পবিত্র ওঙ্কারের প্রতীক, তীর-ধনুক হল মহাশক্তির প্রতীক, গদা হল আনুগত্যের প্রতীক, বজ্র হলো আত্মপ্রত্যয়ের প্রতীক, শক্তি হল খর বুদ্ধির পরিচয়, ঘন্টা হল শক্তির গর্ব খর্ব করার প্রতীক, নাগপাশ হল উচ্চমার্গের চেতনার প্রতীক।
কিন্তু দূর্গার এই মাঙ্গলিক তাৎপর্য আজ অনেকটাই বদলেছে। সকলের মঙ্গল কামনার এই ধর্মীয় লোকাচারের যেমন ভিন্ন ভিন্ন ব্যাখ্যা রয়েছে তেমনি সময়ের প্রেক্ষিতে এই ব্যাখ্যায় বদলেছে প্রাচীন ঐতিহ্য আর মাঙ্গলিক তাৎপর্য। বেদের যুগে এই অলৌকিক ধারণা বদলেছে। সেখানে রুদ্র এসেছে, আদ্যাশক্তি মহামায়া এসেছে, বিষ্ণুর আবির্ভাব হয়েছে। একইসঙ্গে বদলেছে আরাধনা পদ্ধতিও। বেদের যুগে দেবতারা নিরাকার আবার পৌরাণিক যুগে দেবতারা সাকার হলেন। এখন বিজ্ঞানের যুগে অলৌকিক আর অলৌকিক রইল না, বাহ্যিক দিকগুলো সম্পূর্ণ বদলে গেল। সর্বজনের মঙ্গল কামনায় যে আরাধনা তার বদলে এখন শুধুই একটা উৎসব, একটা ফেস্টিভাল। “সর্বজনীন” তকমায় প্রভাবশালীদের ক্ষমতা আস্ফালনের কর্পোরেট পন্থা। সময়ের বদলকে অনিবার্য ধরলেও দশের মঙ্গল ও শুভাশুভের প্রশ্নে এই “উৎসব” কতটা তাৎপর্য বহন করে তা নিয়ে মতবিরোধ থাকবেই।
রাত পোহালেই মহালয়া— পিতৃপক্ষের অবসানে দেবীপক্ষের সূচনা আসন্ন। অশুভের দমনে শুভ শক্তির উন্মেষ, “মহিষাসুরমর্দিনী”। যখন অসুরের দাপটে দেশ ও বিদেশ পর্যুদস্ত তখন দশ ও দেশের কল্যাণে এই শুভশক্তি জাগরূক হোক — এটাই আপামর প্রার্থনা।।

