এসআইআর সত্ত্বেও নতুন ভোটারের আবেদনে খরা ! রাজ্যে জনসংখ্যা কমার আশঙ্কা
সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়
রাজ্যে নতুন প্রজন্মের ভোটার কি কমছে ? গত ১০ বছরের নির্বাচনী পরিসংখ্যানে সেই তথ্যই স্পষ্ট। শুধু তাই নয় নির্বাচনী তথ্য চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে যে রাজ্যে জনসংখ্যা বৃদ্ধির হারও দিনকে দিন গতিহীন হয়ে পড়ছে। গত প্রায় দেড় দশক ধরে জনগণনার কাজ স্তব্ধ থাকলেও নির্বাচনী পরিসংখ্যান জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার তথা নতুন প্রজন্মের ভোটার কমে যাওয়ার চিত্রটি স্পষ্ট করেছে। যদিও, ছাব্বিশের নির্বাচনের আগে স্পেশাল ইনটেনসিভ রিভিশন বা এসআইআর প্রক্রিয়া ভুয়ো ভোটারের নাম বাদ দিয়ে স্বচ্ছ ভোটার তালিকা তৈরির আশা জাগালেও নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে বড় কিছু পরিবর্তন আনতে পারবে বলে নিশ্চিত হতে পারছেন না নির্বাচনী কর্তারাই। চলতি এসআইআর পর্বে রাজ্যের খসড়া ভোটার তালিকায় ৫৮ লক্ষের কিছু বেশি মৃত, স্থায়ীভাবে স্থানান্তরিত, অস্তিত্বহীন এবং ডুপ্লিকেট ভোটারের নাম বাদ গেলেও নতুন ভোটার হিসেবে অন্তর্ভুক্তির জন্য ফর্ম ৬ আবেদনপত্রের সংখ্যা আশানুরূপ হয়নি এখনও। সিইও দপ্তর সূত্রে জানা গেছে, গত ১৬ ডিসেম্বর ২০২৬ নির্বাচনের খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশের আগে প্রায় ২ লক্ষ এবং তালিকা প্রকাশের পর ( ৪ জানুয়ারি পর্যন্ত) প্রায় ৩ লক্ষ ফর্ম ৬ এখনও পর্যন্ত কমিশনে জমা পড়েছে। আগামী ১৫ জানুয়ারি পর্যন্ত ভোটার তালিকায় নতুনভাবে নাম অন্তর্ভুক্তি অথবা নাম বাদ দেওয়ার আবেদন করা যাবে। যার ভিত্তিতেই ২০২৬ সালের বিধানসভা নির্বাচনে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশিত হবে আগামী ১৪ ফেব্রুয়ারি। ২০২৪ সালে নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তির জন্য জমা করা আবেদনপত্রের সংখ্যা ১৪ লক্ষ ৩০ হাজার ৯৯৮। ২০২৬-এ আগামী ১০ দিনে সেই সংখ্যা ছাপিয়ে যাবে কি ? বা কতটা বেশি হবে ? তা নিয়ে সন্দিহান পদস্থ নির্বাচনী আধিকারিকরাই।
বস্তুত, ২০১৪ সালের লোকসভা নির্বাচনের পর থেকেই নির্বাচনী তথ্য অনুযায়ী ফর্ম ৬ আবেদনপত্র পূরণের ক্ষেত্রে সংখ্যা ক্রমশ নিম্নমুখী। নির্বাচনী বছরগুলিতে এই সংখ্যা কিছুটা বৃদ্ধি পেলেও পরবর্তী বছরেই তার গ্রাফ নিম্নমুখী। তবে ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনের পরে নতুন প্রজন্মের ভোটারদের ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্তির আবেদন লক্ষণীয়ভাবে কমেছে। ২০২৬ সালের নির্বাচনের ক্ষেত্রেও এখনো পর্যন্ত সেই ট্রাডিশন বজায় রয়েছে বলে কমিশন সূত্রে খবর। ২০১৪ সালে লোকসভা নির্বাচনের বছরে খসড়া ভোটার তালিকায় ভোটার সংখ্যা ছিল ৫ কোটি ৯৬ লক্ষ ৮১ হাজার যার মধ্যে নতুন ভোটার হিসেবে অন্তর্ভুক্ত হয়েছেন ৩২ লক্ষ ২৯ হাজার এবং নাম বাদ গিয়েছে ৪ লক্ষ ৪১ হাজার।
পরবর্তী বছর ২০১৫ সালে খসড়া ভোটার তালিকায় ভোটার সংখ্যা বাড়লেও নতুন ভোটার হিসেবে ফর্ম ৬ পূরণ করেছেন ২১ লক্ষ ৫৩ হাজার। অর্থাৎ , সংখ্যাতত্ত্বের বিচারে এক ধাক্কায় এক বছরে প্রায় ১১ লক্ষ নতুন প্রজন্মের ভোটার সংখ্যা কমে যায়। ২০১৬ সালে রাজ্য বিধানসভা নির্বাচনের বছরে খসড়া ভোটার তালিকায় ভোটার সংখ্যা ছিল ৬ কোটি ৩৪ লক্ষ ৯৫ হাজার। খসড়া ভোটার তালিকা প্রকাশের পর নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তির ক্ষেত্রে সংখ্যাটি দাঁড়ায় ২৬ লক্ষ ৩৩ হাজার। অর্থাৎ নির্বাচনী বছরে নতুন প্রজন্মের ভোটার সংখ্যা তার পূর্ববর্তী বছরের তুলনায় প্রায় ৫ লক্ষ বেড়ে যায়। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনের বছরেও একই ঘটনার পুনরাবৃত্তি। ওই নির্বাচনী বছরে ভোটার তালিকায় ভোটার সংখ্যা বাড়লেও ২০১৭ এবং ২০১৮ সালের নতুন প্রজন্মের ভোটার তালিকা বৃদ্ধির থেকে ২০১৯-এর নির্বাচনী বছরে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় প্রায় দেড় লক্ষাধিক।
একুশের বিধানসভা নির্বাচনী বছরে খসড়া ভোটার তালিকায় মোট ভোটার সংখ্যা ছিল ৭ কোটি ১৮ লক্ষ ৪৯ হাজার যেখানে নতুন ভোটার হিসেবে অন্তর্ভুক্তির সংখ্যা ২০ লক্ষ ৪৫ হাজার। ২০২২ ও ২০২৩ সালে ভোটার তালিকায় মোট ভোটারের সংখ্যা ছিল যথাক্রমে ৭ কোটি ৩২ লক্ষ এবং ৭ কোটি ৪২ লক্ষ। ২০২৪ সালের লোকসভা নির্বাচনী বছরে সেই সংখ্যা বেড়ে দাঁড়ায় ৭ কোটি ৫৩ লক্ষ ৮৬ হাজার। পাশাপাশি, ২০২২ সালে নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তির সংখ্যা ১৬ লক্ষ ১৩ হাজার হলেও ২০২৩ সালে তা বেড়ে দাঁড়ায় ১৭ লক্ষ ৮৩ হাজারে। যদিও ২০২৪ সালে নতুন ভোটার অন্তর্ভুক্তির সংখ্যা কমে দাঁড়ায় ১৪ লক্ষ ৩০ হাজার।
অর্থাৎ সার্বিকভাবে নির্বাচনী তথ্যের বিচারে গত দশ বছরে রাজ্যে ভোটার তালিকায় নতুন প্রজন্মের অন্তর্ভুক্তির সংখ্যা নিম্নমুখী হয়েছে। একুশের বিধানসভা নির্বাচন থেকে এই অধোগতির চিত্র সর্বাধিক। ২০১৪ সাল থেকে খসড়া ভোটার তালিকায় ভোটার সংখ্যা বাড়লেও নতুন প্রজন্মের ভোটারের সংখ্যা লক্ষ্যণীয়ভাবে কমেছে। ২০১৪ সালে যে সংখ্যা ছিল ৩২ লক্ষ ২৯ হাজার, ২০২৪ সালে তা নেমে দাঁড়িয়েছে ১৪ লক্ষ ৩০ হাজারে। স্বাভাবিকভাবেই সংখ্যা তত্ত্বের বিচারে এই প্রশ্ন জোরালো হচ্ছে যে পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজনীতি সচেতন রাজ্যে ভোট রাজনীতির পাকচক্র থেকে নতুন প্রজন্ম কি দূরে সরছে? নাকি সার্বিকভাবে রাজ্যের জনসংখ্যা কমছে?
উল্লেখযোগ্য, ২০১১ সালের পর দেশে জনগণনা না হওয়ায় জনসংখ্যার তারতম্য বা হ্রাস-বৃদ্ধির বিষয়টি নিয়ে সরকারিভাবে কোন তথ্য বা যুক্তি না মিললেও এই নির্বাচনী পরিসংখ্যান রাজ্যের জনসংখ্যার তারতম্যের বিষয়টি যে স্পষ্ট করেছে তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
প্রসঙ্গত, এসআইআর-এর সৌজন্যে রাজ্যের শাসকদল তথা মুখ্যমন্ত্রী সাধারণ ভোটারদের কাছে ভোটার তালিকায় নাম বাদ গেলেই অবশ্যই ফর্ম ৬ পূরণ করার
আবেদন জানিয়েছেন।
প্রাথমিকভাবে রাজনৈতিক পক্ষের এই আবেদন এবং নাম বাদ যাওয়ার বিতর্কে নির্বাচনে নতুন ভোটারসহ রাজনীতিবিমুখ ভোটারদের অংশগ্রহণ বাড়াবে বলে আশা করা হলেও নির্বাচনী তথ্য অন্য ছবি তুলে ধরেছে। তাছাড়া চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের পর যদি কোনও যোগ্য ভোটার নতুন ভাবে নাম তুলতে চান অথবা বিদেশে বা ভিন রাজ্যে থাকার জন্য শুনানিতে হাজির না হওয়া যোগ্য ভোটার নাম তোলার জন্য ফর্ম ৬ জমা দেন সেই সংখ্যাটা নগণ্যই হতে পারে বলে মনে করা হচ্ছে। সবমিলিয়ে রাজ্যের নির্বাচনী মানচিত্রে ফর্ম ৬ আবেদনপত্র জমার নিরিখে রাজ্যে নতুন প্রজন্মের ভোটার তথা জনসংখ্যা বৃদ্ধির হার নিয়ে আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।

