এসআইআরে ব্রাত্য নন জেলবন্দি, অনাথ ও নিষিদ্ধপল্লীর ভোটাররা, বিশেষ ব্যবস্থা কমিশনের
সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়
“নো ভোটার লেফট বিহাইন্ড”। এই লক্ষ্যকে সামনে রেখেই নির্বাচন পরিচালনা করে নির্বাচন কমিশন। আর যোগ্য ভোটারদের ভোটাধিকার রক্ষার লক্ষ্যপূরণেই দেশজুড়ে এসআইআর। এরাজ্যেও এসআইআর-এর ঢাকে কাঠি পড়েছে। পথে-ঘাটে চায়ের দোকানে রাজ্যজুড়ে শুরু হয়েছে তুমুল রাজনৈতিক চর্চা। এসআইআর নিয়ে রাজনৈতিক চাপান উতোরে সরগরম রাজ্য। এনুমারেশন ফর্ম নিয়ে ভোটারের দুয়ারে বিএলও। কিন্তু জেলের অন্ধকার কুঠুরিতে যে সমস্ত
বিচারাধীন বন্দি বা সাজাপ্রাপ্ত বন্দি এমনকি ফাঁসির সাজাপ্রাপ্ত অথচ বৈধ ভোটাররা রয়েছেন অথবা বিভিন্ন আবাসিক হোমে বাবা-মায়ের পরিচয়হীন বা ভবঘুরে অনাথ এমনকি রেড লাইট এলাকার বাসিন্দারা এই উত্তাপের আঁচ কতটুকু পাচ্ছেন? এদের মধ্যে অনেকেই হয়তো যোগ্য ভোটার, কিন্তু তাঁদের কাছে এনুমারেশন ফর্ম পৌঁছবে কি? তাঁদের নাম ভোটার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হবে কিভাবে? কিংবা পরিযায়ী শ্রমিক! সামাজিক স্বীকৃতিহীন অথবা সমাজের চোখে অপরাধী অথচ যোগ্য ভোটার তারা কি নির্বাচন কমিশনের লক্ষ্য পূরণের আওতাভুক্ত হতে পারবেন?
বরাভয় দিচ্ছে রাজ্যের সিইও দপ্তর। সমাজের সর্বস্তরে উঁচু-নিচু ভেদাভেদ না করে কোনও বৈধ ভোটার ভোটাধিকার থেকে যাতে বঞ্চিত না হন তার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে আশ্বাস সিইও দপ্তরের।
নির্বাচনী বিধি অনুযায়ী অপ্রাপ্তবয়স্ক, ভোটার তালিকায় নাম না থাকা ব্যক্তি, আদালত স্বীকৃত মানসিক ভারসাম্যহীন ও আদালতের নির্দেশে ভোটদানের আধিকার হারানো ব্যক্তি ভোটদানে উপযুক্ত নন। বাকি সকলেই যাদের ভোটার তালিকায় নাম রয়েছে তাঁরা সকলেই ভোট দেওয়ার যোগ্য। তিনি বিচারাধীন বা সাজাপ্রাপ্ত বন্দি হতে পারেন অথবা কোনও আবাসিক হোমের বাসিন্দা, পরিযায়ী শ্রমিক বা নিষিদ্ধপল্লীর বাসিন্দা হতে পারেন। কমিশনের নিয়ম অনুযায়ী বিএলও ভোটার তালিকায় উল্লিখিত ঠিকানাতেই গিয়ে নির্দিষ্ট ভোটারের জন্য এনুমারেশন ফর্ম দিয়ে আসবেন। যদি ওই ভোটার জেলবন্দি হন বা আবাসিক হোমের বাসিন্দা হন তাহলে জেলে বা হোমে ফর্ম দিতে যাবেন না বিএলও। ওই ভোটারের পরিজন বা নিকটাত্মীয়ের কাছে ফর্ম দিয়ে আসবেন বিএলও। পরিবারের প্রধান ওই ভোটার সম্পর্কিত তথ্য ফর্মে লিপিবদ্ধ করতে পারেন অথবা জেলে বা হোমে গিয়ে নির্দিষ্ট ভোটারের সই করিয়ে আনতে পারেন। পরিযায়ী শ্রমিকদের ক্ষেত্রেও একই নিয়ম। যদি কোন ভোটার অনাথ আশ্রমের বাসিন্দা হন বা কোন আবাসিক হোমে থাকেন কিন্তু ভোটার তালিকায় তার নির্দিষ্ট ঠিকানা রয়েছে সে ক্ষেত্রে বিএলও ওই ঠিকানায় এনুমারেশন ফর্ম নিয়ে যাবেন। স্থানীয় বাসিন্দা বা প্রতিবেশীরা সেক্ষেত্রে যদি ওই ভোটারের নির্দিষ্ট আশ্রয়ের কথা জানাতে পারেন তাহলে তদনুযায়ী পদক্ষেপ করবেন নির্বাচনকর্মীরা। অথবা হোম কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে ওই ভোটারের ভোটদানের প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হবে। রেডলাইট এলাকা বা নিষিদ্ধ পল্লীর বাসিন্দার ভোটারের জন্য নিয়ম তথৈবচ। নির্দিষ্ট ঠিকানাতেই যাবেন বিএলও। সেখানে গিয়ে প্রতিবেশী বা পরিজনদের কাছে এনুমারেশন ফর্ম দেবেন তিনি। প্রতিটি ক্ষেত্রেই ওই ভোটারের নাম ভোটার তালিকায় থাকতে হবে। তবেই তিনি এনুমারেশন ফর্ম পাওয়ার যোগ্য হিসেবে বিবেচিত হবেন। এমনকি এরা সকলেই অনলাইনে এনুমারেশন ফর্ম ফিলআপ করতে পারবেন। সিইও মনোজ কুমার আগরওয়াল জানিয়েছেন,
“বন্দিরা যদি নিজেরা এনুমারেশন ফর্ম ফিল আপ করতে চান বা নিজেদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে চান সেক্ষেত্রে জেল কর্তৃপক্ষকেই যাবতীয় ব্যবস্থা নিতে হবে। যদি ওই বন্দি যোগ্য ভোটার হন তাহলে তাকে ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে দিতে হবে।” এ ব্যাপারে রাজ্যের অতিরিক্ত মুখ্য সচিব (কারা) হৃদেশ মোহন-কে প্রয়োজনীয় নির্দেশিকা পাঠানো হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন সিইও। একইভাবে আবাসিক হোম অথবা নিষিদ্ধপল্লীর ভোটারদের ক্ষেত্রেও একই পদক্ষেপ করা হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন সিইও।
কমিশনের পদস্থ কর্তাদের মতে, যতক্ষণ পর্যন্ত কোনও বন্দি সাজাপ্রাপ্ত না হন ততক্ষণ পর্যন্ত তার ভোটে প্রার্থী হওয়ার অধিকার থাকে। তেমনি প্রতিটি বিচারাধীন বন্দি অথবা সাজাপ্রাপ্ত বন্দী এমনকি ফাঁসির দণ্ডাদেশ প্রাপ্ত বন্দির ক্ষেত্রেও যদি তিনি যোগ্য ভোটার বলে বিবেচিত হন তার ভোটাধিকার অক্ষুন্ন থাকে। অনাথ বা ভবঘুরে এবং নিষিদ্ধপল্লীর বাসিন্দা হলেও সেক্ষেত্রে তাঁর পরিচয় একটাই, তিনি ভোটার। সামাজিক স্বীকৃতি বা বৈষম্যের বিষয়টি ভোটাধিকার প্রয়োগের ক্ষেত্রে কোন অন্তরায় হতে পারে না। সেক্ষেত্রে যোগ্য ভোটারের ভোটাধিকার প্রয়োগের দায়িত্ব বর্তায় নির্বাচন কমিশনের ঘাড়েই। তদনুযায়ী যথোপযুক্ত ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলেও জানিয়েছেন কমিশনের পদস্থ কর্তারা।

