হোয়াটসঅ্যাপে ‘লজিকাল ডিসক্রিপ্যান্সি’ ম্যানুয়াল !! কমিশনের অনড় মনোভাবেই বিপত্তি, পিছোবে এসআইআর ?
সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়
মুখ্যমন্ত্রী অগেই দাবি করেছিলেন, এবার সেই ইঙ্গিত মিলল সিইও-র গলায়। ‘ লজিকাল ডিসক্রিপ্যান্সি ‘ নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশের পর এস আই আর প্রক্রিয়া, পিছোতে পারে বলে সম্ভাবনার কথা শোনালেন খোদ সিইও মনোজ কুমার আগরওয়াল। যেহেতু লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সি নিয়ে আদালতের রায় ক্লেমস এন্ড অবজেকশনের জন্য অতিরিক্ত দশ দিন সময় দিতে নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট সেক্ষেত্রে আগামী সাত ফেব্রুয়ারির মধ্যে এসআইআর শুনানি পর্ব শেষ করা কার্যত অসম্ভব। এই যুক্তি মেনে নিয়েই সিইও জানিয়েছেন
” ৭ তারিখের মধ্যে এই কাজ শেষ হবে না। শুনানির সময় বাড়াতে হবে। এজন্য কমিশন নির্দিষ্ট সময় বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করবে।” শুনানি পিছনে গোটা এসআইআর প্রক্রিয়ায় তো পিছাতে হবে ? তাহলে কি ১৪ই ফেব্রুয়ারি চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশিত হবে না? উত্তরে মনোজবাবু জানান ” প্রয়োজনে গোটা প্রক্রিয়াটাই পিছাতে পারে। তবে সুষ্ঠু পরিবেশ বজায় না থাকলে শুনানি করা যাবে না।” স্বাভাবিকভাবেই রাজ্যে এসআইআর পর্ব পিছোনর সম্ভাবনা জোরালো। উল্লেখযোগ্য, এস আই আর পর্ব যে পিছনে পারে, সে সম্ভাবনার কথা আগেই উল্লেখ করেছিলেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। সেক্ষেত্রে ভোট পিছিয়ে দিয়ে “রাজনৈতিক চক্রান্ত” করার চেষ্টা চলছে বলে উল্লেখ করেছিলেন তিনি। যদিও লজিকাল ডিসক্রিপ্যান্সি ‘ নিয়ে কমিশনের অনড় মনোভাবকেই এক্ষেত্রে দায়ী করছেন পদস্থ কর্তারা।
মূলত, কোনও বিজ্ঞপ্তি বা নোটিফিকেশন নয়, ‘লজিকাল ডিসক্রিপ্যান্সি ‘ বা ‘ যুক্তিগত অসঙ্গতি’ কোন কোন ক্ষেত্রে নির্ধারিত হবে বা সেক্ষেত্রে কি কি নথি খতিয়ে দেখা হবে তার যাবতীয় নির্দেশ এসেছে হোয়াটসঅ্যাপে। কমিশন সূত্রে জানা গেছে, যেহেতু এই নির্দেশ ‘ ইন্টার অফিস। অ্যাকসেস ‘ হিসেবে বিবেচ্য তাই প্রাথমিকভাবে এনিয়ে আপত্তি ওঠেনি। কিন্তু এই অসঙ্গতির আওতায় যারা এসেছেন তাঁদের অধিকাংশের ক্ষেত্রে তা ‘মেশিনারি এরর’ বা কম্পিউটারে তথ্য লিপিবদ্ধ করতে গিয়ে ভুল হয়েছে অথবা ২০০২ সালের ভোটার তালিকা থেকে স্ক্যান করে পিডিএফ করা কপি কম্পিউটারে যথাযথভাবে লিপিবদ্ধ হয়নি। সেক্ষেত্রে নির্বাচন কর্মীদের মাধ্যমে তা ঠিক করে দেওয়ার জন্য কমিশনকে প্রস্তাব দেওয়া হলেও তা মান্যতা পায়নি। এমনকি এধরনের ভোটারের সংখ্যা ৩০ লক্ষ ছাড়াবে বলেও পদস্থ আধিকারিকরা জানান কমিশনের কর্তাদের। সেক্ষেত্রে এই বিপুল সংখ্যার ভোটারকে শুনানি করে এসআইআরের কাজ সম্পূর্ণ করতে এবং নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে চূড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশ করতে যথেষ্ট বেগ পেতে হবে বলেও আধিকারিকরা কমিশনকে সতর্ক করেন। যদিও আধিকারিকদের কথায় কর্ণপাত না করে কমিশন কিছুটা ‘গা-জোয়ারি’ মনোভাব দেখিয়ে হোয়াটসঅ্যাপে পাঠানো নির্দিষ্ট গাইডলাইন অনুযায়ী যে ভোটারদের ক্ষেত্রে অসংগতি দেখা দেবে তাদের সবাইকে শুনানিতে ডাকার সিদ্ধান্তে অনড় থাকে বলে। আর কমিশনের এই মনোভাবের জেরেই পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজনীতি সচেতন রাজ্যে ‘লজিকাল ডিসক্রিপ্যান্সি’ নিয়ে বিতর্ক দানা বাধে। রাজ্যের শাসক দল বেশ কিছুদিন ধরেই এই মনোভাবের প্রতিবাদ জানিয়েছে। খোদ মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে এই বিষয়ে চিঠিও দেন। কিন্তু বরফ গলেনি, বরং এ ক্ষেত্রেও নিত্য নতুন গাইডলাইন পরিবর্তন করেছে কমিশন। এই পরিস্থিতিতে সোমবার লজিকাল ডিসক্রিপ্যান্সি নিয়ে সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ নতুন করে ফাঁপরে ফেলেছে কমিশনকে। বিশেষ করে এই ইস্যুতে ভোটারদের স্বার্থে ন্যূনতম ১৩ দিনের যে অতিরিক্ত সময় সীমা দেওয়ার নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট তাতে নির্দিষ্ট ডেডলাইন মেনে এস আই আর এর কাজ সম্পূর্ণ করার ক্ষেত্রে যথেষ্ট সমস্যায় পড়তে হতে পারে রাজ্যের নির্বাচন কর্মীদের।
বস্তুত, ভোটার তালিকায় বানান ভুল বা অক্ষরগত ত্রুটি, অথবা ২০০২-এর ভোটার তালিকার সঙ্গে তথ্যগত অসামঞ্জস্যের কারণে যাদের ‘লজিক্যাল ডিসক্রিপেন্সির’ আওতায় আনা হয়েছে, সেই সংখ্যা প্রায় ৩০ থেকে ৩৫ লক্ষ। এত বিপুল সংখ্যক ভোটারকে কার্যত অল্প সময়ের মধ্যে শুনানির জন্য ডেকে পাঠানো বাস্তবে কতটা সম্ভব, তা নিয়ে সোমবার দিল্লিতে মুখ্য নির্বাচন কমিশনের সঙ্গে রাজ্যের সিইও বৈঠকে আলোচনা হয়। শুনানির পরিবর্তে খাতায়-কলমে বা প্রশাসনিকভাবে এই ধরনের ছোটখাটো ত্রুটি নিষ্পত্তি করা যায় কি না সেই বিষয়টি নিয়েও ভাবনা-চিন্তা করছে কমিশন বলে জানা গেছে। এর আগে ৮৫ বছরের বেশি বয়সী ভোটারদের বাড়িতে গিয়ে শুনানি করা, বিদেশে বসবাসকারী বা পড়াশোনার জন্য যাওয়া ভোটারদের শুনানির জন্য বিশেষ পোর্টাল তৈরি করা, ছোটখাটো ভুল ভ্রান্তির জন্য আধিকারিক পর্যায়ে তা নিষ্পত্তি করার একাধিক প্রস্তাব কমিশনকে রাজ্য সিইও দপ্তর থেকে পাঠানো হয়। যেগুলি কমিশনের পক্ষ থেকেও মান্যতা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু ৩২ লক্ষের বেশি ভোটার যারা লজিকাল ডিসক্রিপ্যান্সির আওতাভুক্ত তাঁদের জন্য কমিশনের অনড় মনোভাব এই পদ্ধতিকে আরও জটিল করে তুলেছে বলে মনে করা হচ্ছে। অবশেষে সুপ্রিম কোর্টের হস্তক্ষেপে সাধারণ ভোটারদের সুরাহা মিলবে কি ? রাজ্যের এস আই আর পর্বে এই প্রশ্নই এখন বড় হয়ে দাঁড়িয়েছে। যদিও আইনি জটিলতা শেষ হলেও শুনানি পর্বে যে আরও বেশি সংখ্যক ভোটারকে শুনানি কেন্দ্রে হাজিরা দিতে হবে তারও ইঙ্গিত দিয়েছে কমিশন।

