কেন্দ্রীয় ‘চক্রব্যুহে’ সিইও, ঘরে-বাইরে প্রশ্ন-চর্চা
সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়
ইনসাসধারী কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা ব্যুহে রাজ্যের সিইও। এই ঘটনা রাজ্যের নির্বাচনী ইতিহাসে নজির সৃষ্টি করলেও ” একা সিইও কেন ? “এই প্রশ্নেই এখন ঘরে-বাইরে জোর চর্চার মুখে সিইও মনোজ কুমার আগরওয়াল। কি এমন পরিস্থিতি হল যে সিইও-কে বাড়ি থেকে দপ্তর পর্যন্ত নিরাপত্তা বেষ্টনীতে ঘিরে থাকতে হলো ? বরাবর যে কলকাতা পুলিশ সিইও সহ গোটা দপ্তরকে নিরাপত্তা দিয়ে এসেছে তাদের ক্ষেত্রে কি গাফিলতি ছিল যে সিইও-র ব্যক্তিগত নিরাপত্তায় ১১ জন কেন্দ্রীয় জওয়ানকে দায়িত্ব দেওয়া হলো? এই প্রশ্নই এখন ঘুরপাক খাচ্ছে সিইও দপ্তর থেকে প্রশাসনিক ও রাজনৈতিক আঙিনায়।
” আমি কোনও নিরাপত্তা চাইনি। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রক মনে করেছে তাই ওরা নিরাপত্তারক্ষী পাঠিয়েছে।” বস্তুত, সিইও মনোজবাবুর এই বক্তব্যকে খোলা মনে মানতে পারছেন না তাঁর দপ্তরের কর্মী-আধিকারিকরাই। তাঁদের বক্তব্য, পশ্চিমবঙ্গের মতো রাজনৈতিক সংবেদনশীল রাজ্যে নির্বাচন পরিচালনা করা যথেষ্ট জটিল ও ঝুঁকিপূর্ণ বটে। কিন্তু দীর্ঘদিন ধরে বাম অথবা তৃণমূল আমলেও রাজ্যের সিইও দপ্তর তা পরিচালনা করে আসছে। খোদ সিইওর ঘরে কখনো বামেরা কখনো বা তৃণমূল অবস্থান করেছে। সেক্ষেত্রে নির্বাচন কমিশনের মত একটি সাংবিধানিক প্রতিষ্ঠানের মূল কর্তাকে কেন্দ্রীয় নিরাপত্তা সঙ্গে নিয়ে চলতে হয়নি। এবারের নির্বাচনে এস আই আর পর্ব অন্য মাত্রা যোগ করেছে , তা নিয়ে অনেক রাজনৈতিক চাপানউতোর, বাক-বিতণ্ডা সৃষ্টি হয়েছে, বিক্ষোভ অবস্থান হয়েছে ঠিকই। কিন্তু নির্বাচন মানেই তো রাজনৈতিক দল তথা রাজনৈতিক বিতর্ক থাকবেই। নানা মুনির নানা মতকে প্রাধান্য দিয়ে ভোটারদের ভোটদানের অধিকারকে সুরক্ষিত করাই তো নির্বাচন কমিশনের কাজ। সিইওর নেতৃত্বে গোটা দপ্তরসহ রাজ্যজুড়ে নির্বাচন কর্মী এবং বিএলও-রা নানাভাবে ঝুঁকিপূর্ণ দায়িত্ব পালন করেন। সেক্ষেত্রে সিইও একা নিরাপত্তার অভাব বোধ করলে গোটা নির্বাচন প্রক্রিয়া তথা নির্বাচন কর্মীদের মধ্যে ভুল বার্তা পৌঁছয়। রাজ্য স্বরাষ্ট্র দপ্তরের আধিকারিকরা জানিয়েছেন ” নির্বাচন কমিশন উচ্চ ক্ষমতা সম্পন্ন সাংবিধানিক সংস্থা। তারা নিজেরা মনে করলে তাদের যে কোন পদাধিকারীকে নিরাপত্তা দিতেই পারে। তবে যাকে নিরাপত্তা দেওয়া হচ্ছে তার মনোভাবটাও সে ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ। নিজের সাংবিধানিক দায়বদ্ধতার কথা ভেবে তিনি কিভাবে তা ব্যবহার করবেন সেটা তাঁর উপর বর্তায়। যে প্রশ্নটা এখন উঠছে সে বিষয়ে বিবেচনার দায়িত্ব তাঁরই ।”
বস্তুত ২৬-এর নির্বাচন উপলক্ষে এস আই আর নিয়ে প্রথম থেকেই এরাজ্যে বিরোধিতার সুর চড়িয়েছেন মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। গত প্রায় এক মাস ধরে সিইও দপ্তরের সামনে লাগাতার অবস্থান বিক্ষোভ চলেছে। এমনকি সিইও দপ্তরের অন্দরেই ধরনায় বসে কার্যত দপ্তরের আধিকারিক কর্মীদের নিরাপত্তার ক্ষেত্রে প্রশ্নচিহ্ন তুলে দিয়েছিল বিএলও-দের অধিকার রক্ষা মঞ্চ। যদিও তা নিয়ে দপ্তরের কাজকর্মে নানা জটিলতা তৈরি হলেও নিরাপত্তাহীনতায় ভুগছেন এমন কথা বলতে শোনা যায়নি সাধারণ কর্মী থেকে পদস্থ আধিকারিকদের। বরং নির্বাচন কমিশন থেকেই বারবার কলকাতা পুলিশকে চিঠি দিয়ে সিইও এবং তাঁর দপ্তরের নিরাপত্তা নিয়ে বাড়তি গুরুত্ব দেওয়ার কথা জানানো হয়েছে। হাইকোর্টও সিইও দপ্তরের সব আধিকারিক-কর্মীদের যথাযথ সুরক্ষা নিয়ে সওয়াল করেছে। দপ্তরের বাইরে রাজপথে সিইও-র কনভয় সাময়িক বিক্ষোভের মুখে পড়েছিল ঠিকই কিন্তু কলকাতা পুলিশের হস্তক্ষেপেই তা মিটে যায়। বিক্ষোভ ও ধর্না মঞ্চ নিয়ে সিইও দপ্তর ও সব কর্মীদের বাড়তি নিরাপত্তা নিয়ে উদ্বেগ জানিয়ে কলকাতা পুলিশকেই যথাযথ উদ্যোগ নিতে চিঠি দিয়েছে নির্বাচন কমিশন। দপ্তরের পদস্থ আধিকারিকদের মতে
” সিইও দপ্তর তথা নির্বাচন কমিশন নির্বাচন পরিচালনার কাজ করে যার সঙ্গে সরকারি মেকানিজম এবং রাজনৈতিক দল ওতপ্রোতভাবে জড়িত। রাজনৈতিক দলগুলোকে সঙ্গে নিয়েই দীর্ঘদিন নির্বাচন পরিচালনা করে আসছে কমিশন। যেকোনো বিবাদ বিতর্ক আলোচনার মাধ্যমে মিটিয়ে নেওয়াই কমিশনের কাজ। সেক্ষেত্রে কমিশন নিজেই যদি সরকারের প্রতি আস্থাহীন হয়ে নিরাপত্তাহীনতায় ভোগে তাহলে স্বচ্ছ ও অবাধ নির্বাচন পরিচালনার কাজ অর্থহীন হয়ে দাঁড়ায়। সবচেয়ে বড় কথা, বিএলও সহ যে নির্বাচনকর্মীরা মানুষের মাঝখানে থেকে মাঠে-ঘাটে নির্বাচনের কাজ করছেন তাদের নিরাপত্তা সবার আগে দেখা উচিত। ” রাজ্যের মন্ত্রী চন্দ্রিমা ভট্টাচার্যের মতে ” এরাজ্যে বিজেপির এজেন্ডা অনুযায়ী নির্বাচন পরিচালনা করাই কমিশন তথা সিইও-র মূল লক্ষ্য। তারই প্রতিফলন ঘটছে প্রতি পদক্ষেপে। বিএলও-দের সঙ্গে শুধু নয় দপ্তরের কর্মীদের সঙ্গেও বিমাতৃসুলভ আচরণের নমুনা দেখা যাচ্ছে। “

