বিশেষহেডলাইন

কলকাতার কিডনি বিকল! প্রকৃতির রোষে তাই কলকাতায় বিপদসঙ্কেত ?

 

সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়

অন্তত বছর দশেক আগে পর্যন্ত মুম্বই বা চেন্নাই নিয়মিত বন্যায় ভেসে গেলেও দিব্যি টিকে যেত কলকাতা। আজ ভেঙে পড়েছে পুরো ব্যবস্থাটাই। চলছে যথেচ্ছ প্রোমোটিং, জলাভূমি ভরাট, নগরায়ণ ও দূষণ। ফলে নজিরবিহীন সংকটের মুখে শহর কলকাতা। প্রকৃতি সামান্য রুষ্ট হলেই আজ ভেসে যাচ্ছে কলকাতা। জমা জলে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে, জলবাহিত ও মশাবাহিত রোগ বাড়ছে। অজানা জ্বরে হাসপাতাল উপচে পড়ছে। ড্রেনগুলো অবরুদ্ধ। জমা জলে তড়িদাহত হয়ে মারা যাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। ক’দিন আগেই কয়েক ঘন্টার ভারি বৃষ্টিতে বানভাসী হয়ে যায় শহর কলকাতা। তা নিয়ে গোটা শহর শুধু নয় গোটা বাংলা জুড়েই ওঠে ত্রাহি ত্রাহি রব। যেন কলকাতার মৃত্যুঘন্টা বেজেছে।

ভৌগলিকভাবে কলকাতা ভারতের অন্যতম নিচু শহর।
কলকাতার পশ্চিমে গঙ্গা, অথচ শহরের ঢাল পুবে। প্রতিদিন শহরে প্রায় হাজার মিলিয়ন লিটার তরল বর্জ্য উৎপন্ন হয়। পৃথিবীর বিভিন্ন বড় বড় শহরে এই পরিমাণ বর্জ্যকে সাফাই করার জন্য কোটি কোটি টাকা খরচ করে নিকাশি প্ল্যান্ট তৈরি করা হয়। কলকাতায় এমন একটিও ‘প্ল্যান্ট’ নেই। ছিলও না কোনওকালে। ঢাল যেহেতু বিপরীতে তাই গঙ্গামুখী নয় ওই বিপুল বর্জ্য-জল। তাহলে অতখানি নোংরা বর্জ্যমিশ্রিত জল যায় কোথায়? এই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার কাজ শুরু হয় বাম জমানায়। প্রথমে হদিশ না মিললেও বেশ কিছুদিন পরে নিকাশি নালা বা খালগুলির গতিপথ ধরে খোঁজ চালিয়ে অবশেষে খোঁজ মেলে কলকাতার পূর্ব প্রান্তের বিস্তীর্ণ জলাভূমির। বর্তমানে যার পোশাকি নাম ‘ ইস্ট ক্যালকাটা ওয়েটল্যান্ড ‘।
আপাতভাবে দেখলে যা জলাজমি—আম জনতার ভাষায়, যা কোনও কাজে আসে না, সেখানেই লুকিয়ে এই প্রশ্নের উত্তর। পরীক্ষা-নিরীক্ষার ফলাফলে রীতিমত ‘চক্ষু চড়কগাছ’। কেন? কলকাতার সিংহভাগ বর্জ্য-জল এখানেই এসে মেশে যে মিশ্রণে ৯৫% জল এবং ৫% জীবাণু। এই বিশাল জলাভূমিতে ওই বর্জ্য-জলের জীবাণু জলজ বাস্তুতন্ত্রে শৈবাল ও মাছের খাদ্যে পরিণত হয়। ফলে স্রেফ প্রাকৃতিক বাস্তুতন্ত্রেই সূর্যালোকের অতিবেগুনি রশ্মির সাহায্যে ও সালোকসংশ্লেষ প্রক্রিয়ায় পুরো জল পরিশুদ্ধ অবস্থায় চলে আসে, বিপুল মাছের ভাণ্ডার তৈরি করে। পুরোটাই সম্পূর্ণ বিনামূল্যে,বিন্দুমাত্রও শোধন করাতে হয় না!

কলকাতার একদিকে গঙ্গার প্রবাহ, অন্যদিকে প্রাকৃতিক জলাভূমি। ময়দান যদি তিলোত্তমা কলকাতার ফুসফুস হয়, তাহলে এই জলাভূমিই হল তার কিডনি।
এই পাম্প করে জল বের করা বা রাস্তা খুঁড়ে বছরের পর বছর পাইপ বসিয়ে চলা বা লকগেটের ওপর নির্ভর করা—এগুলি সবই আসলে ‘ডায়ালিসিস’ পদ্ধতি। যে পদ্ধতিতে কৃত্রিমভাবে রক্ত পরিশোধন করে কিডনির কাজ চালানো হয়। সকলের অলক্ষ্যে ক্রমশ পাঁক জমে, দূষিত ও বিষাক্ত রাসায়নিক জমে ও ভরাট হয়ে বিকল হয়ে পড়ছে কলকাতার আসল সেই ‘কিডনি’—এই জলাভূমি। প্রায় তিরিশ হাজার মানুষের জীবিকা সরাসরিভাবে জড়িত এই জলাভূমির সঙ্গে। আজও আমরা জানিই না, রোজ গরম গরম ভাতের সঙ্গে পাতে যে মাছের ঝোল বা ঝাল খাই, তার বেশিটাই আসে এই ভেড়ি থেকে। পাশাপাশি, বিপুল পরিমাণ শাকসবজির জোগান দেয় এই এলাকা। স্রেফ এই কারণেই ভারতের সমস্ত মহানগরের মধ্যে বাজার খরচের ব্যাপারে সবচেয়ে সস্তা আমাদের কলকাতা। পাশাপাশি, বিপুল পরিমাণ অক্সিজেনেরও জোগান দেয় এই জলাভূমি। কার্যত একটি পয়সাও খরচ না করে দূষিত জল নিয়ে জলাভূমি ফেরত দেয় টাটকা জল, মাছ, শাক-সবজি ও অক্সিজেন।
এবং এর সবচেয়ে রহস্যময় ভূমিকা হল বন্যা নিয়ন্ত্রণ। যে বিপুল পরিমাণ জলে প্রতিদিন ভেসে যেতে পারত কলকাতা, তার বেশিরভাগটাই টেনে নেয় এই জলাভূমি। তারপর অবশিষ্ট চলে যায় বিদ্যাধরী নদীতে।

যদিও এই জলাভূমির গুরুত্ব ও প্রাকৃতিক বিশুদ্ধতা তৎকালীন বামফ্রন্ট সরকারকে বোঝাতে হিমশিম খেতে হয়েছিল গবেষকদের। জলাভূমি যে কত বড় প্রাকৃতিক জলশোধক তা চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দেন গবেষক-ইঞ্জিনিয়াররা। এই জলাভূমি নিয়ে খবর পৌঁছয় সুইজারল্যান্ডে, আন্তর্জাতিক জলাভূমি সংরক্ষণ সংস্থার সদর দফতরে। আসেন বিদেশি বিশেষজ্ঞরা। অবাক হয়ে গিয়েছিলেন সকলেই। কারণ এরকম প্রাকৃতিক শোধন ভারত কেন, গোটা দুনিয়াতেও দ্বিতীয়টি নেই।
অবশেষে ২০০২ সালে পশ্চিমবঙ্গের প্রথম ‘রামসার সাইট’ হিসেবে আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি পায় পূর্ব কলকাতা জলাভূমি। আজ যারা নলবন, নুনের ভেড়ি বা ক্যাপ্টেন ভেড়িতে ঘুরতে বা পিকনিক করতে যান তারা বেশিরভাগই হয়তো জানেন না এই জলাভূমি একটি ‘আন্তর্জাতিক রামসার সাইট’ হিসেবে স্বীকৃত।

অবশ্য স্বীকৃতি পেলে কি হবে ততদিনে সেই অগভীর জলাভূমির বেশ খানিকটা ভরাট করে সল্টলেক তৈরি হয়ে গিয়েছে। গঙ্গা থেকে পলি তুলে লবণ হ্রদের প্রায় অর্ধেকটা ভরাট হয়েছিল। ডাচ সংস্থা নেডেকো ও একদল যুগোস্লাভ ইঞ্জিনিয়ার দুর্দান্ত পরিকল্পনা করে নগর পরিকল্পনা করেছিলেন। ১৯৭২ সালে জাতীয় কংগ্রেসের বার্ষিক অধিবেশনও বসেছিল সল্টলেকে। তখনই তৎকালীন প্রধানমন্ত্রী ইন্দিরা গান্ধীর থাকার জন্য তৈরি হয়েছিল ছোট্ট একটি বাংলো, নাম দেওয়া হয় ‘ইন্দিরা ভবন’। সেই ইন্দিরা ভবনের পরবর্তী বাসিন্দা জ্যোতি বসুর মুখ্যমন্ত্রিত্বকালে সল্টলেকের আকার বাড়তে শুরু করে দ্রুত। শুরু হয় অনিয়ন্ত্রিত নগরায়ণ। তখন জোর যার মুলুক তার। প্রোমোটারি শক্তি পাখনা মেলছে। ১৯৯০ সাল নাগাদ জ্যোতি বসুর সরকার ঘোষণা করে—ওই জলাভূমি বুজিয়ে একটা বিশাল বড় বাণিজ্যকেন্দ্র স্থাপন করা হবে। একটি স্বেচ্ছাসেবী সংস্থা ‘PUBLIC’ (People United for Better Living in Calcutta) হাইকোর্টে মামলা করে। “ওই জলাভূমি বোজানো চলবে না, তাকে সংরক্ষণ করতে হবে “। ‘৯২ সালে দেশের অন্যতম প্রথম পরিবেশবান্ধব রায় দেয় কলকাতা হাইকোর্ট। কিন্তু ততদিনে অনেকটাই ক্ষতি হয়ে গেছে এই আন্তর্জাতিক স্বীকৃত সাইট পূর্ব কলকাতা জলাভূমির।

বর্তমান ভারতে রামসার সাইটের সংখ্যা চল্লিশের বেশি। তালিকায় আছে চিলিকা হ্রদ, মণিপুরের লোকটাক হ্রদ, কোল্লেরু হ্রদ, লোনার ক্রেটার, ভিতরকণিকা, কাশ্মীরের উলার হ্রদ। পশ্চিমবঙ্গ থেকে আছে দু’টি। দ্বিতীয়টি আয়তনে ভারতের বৃহত্তম রামসার সাইট—সুন্দরবন। সুন্দরবন বহুল আলোচিত, চর্চিত এবং দর্শিতও। কিন্তু পশ্চিমবঙ্গের প্রথম রামসার সাইটটি আমাদের চোখের সামনেই যেন অদৃশ্য হয়ে রয়েছে। স্বীকৃতি এলেও ধ্বংসলীলা থামেনি। বছরের পর বছর ধরে চলছে যথেচ্ছ প্রোমোটিং, জলাভূমি ভরাট, নগরায়ণ ও দূষণ। ফলে নজিরবিহীন সংকটের মুখে পূর্ব কলকাতার এই জলাভূমি। আজ যখন কলকাতার বিস্তীর্ণ অংশ প্লাবিত হচ্ছে, কলকাতার অস্তিত্ব নিয়ে চর্চা তুঙ্গে তখনও রাজনৈতিক স্তরে একে অপরের দোষারোপের পালা চলছে পাল্লা দিয়ে। রোজকার সান্ধ্য আড্ডায়, চায়ের পেয়ালার তুফানে উঠে আসে অনেক ভারি ভারি প্রসঙ্গ—লকগেট কখন খুলবে, কর্পোরেশন পাম্প চালাচ্ছে না কেন? গঙ্গা থাকতেও শহরের জল-নিকাশির এই হাল কেন? ইত্যাদি, ইত্যাদি।
অথচ এইগুলোর কোনোটাই যে স্থায়ী সমাধান নয়, তা আমজনতা বুঝতে চান না, রাজনীতিবিদরাও বুঝতে দেন না। কারণ বুঝতে দিলে তাঁদের বিপদ। রাজনীতির নেতাদের ব্যবসাটাই দাঁড়িয়ে আছে এই জলাভূমি ভরাটের ওপর। পূর্বতন বাম জমানায় যা শুরু হয় সেই ট্র্যাডিশন সমানে চলছে।

Share with