বিশেষহেডলাইন

কমিশনের ডেডলাইনকে ‘থোড়াই কেয়ার’ !! গুরুত্ব হারাচ্ছে নির্বাচন কমিশন??

 

সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়

একের পর এক নির্বাচনী বিধিভঙ্গ এবং তা নিয়ে শাস্তির সুপারিশ করে একের পর এক ডেডলাইন। যদিও রাজ্য প্রশাসনের শীর্ষস্তর থেকে নিচুস্তর পর্যন্ত নির্বাচন কমিশনের নির্দেশকে থোড়াই কেয়ার। একাধিক ক্ষেত্রে ডেডলাইন পেরোলেও সাংবিধানিক সংস্থার নির্দেশ মান্যতায় ন্যূনতম ভ্রূক্ষেপ নেই রাজ্য প্রশাসনের। অথচ আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে কমিশনের এই
‘ তারিখ পে তারিখ ‘ নির্দেশিকা নিয়ে নয়া আশঙ্কা তৈরি হয়েছে ভোটারদের মনে। রাজ্য প্রশাসনের বিরুদ্ধে সংবিধানের নিয়মভঙ্গের অভিযোগ তুলে একের পর এক চিঠিতে গর্জন করলেও কার্যত রাজ্যের সঙ্গে প্রশাসনিক এমনকি আইনি লড়াইতে নির্বাচন কমিশনের অসহায় পরিস্থিতি ও অন্ত:সারশূন্যতাই প্রকট হয়েছে বলে মনে করছেন ভোটাররা। শুধু ভোটাররাই নয় কমিশনের পদস্থ আধিকারিকদের মধ্যেও কমিশনের নির্ভরযোগ্যতা প্রশ্নের মুখে। এমতাবস্থায় রাজ্যে এসআইআর পর্বে রাজ্য প্রশাসনের কর্মীদের দিয়েই স্বচ্ছ্ব ও নিরপেক্ষ ভোটার তালিকা তৈরির কাজ আদৌ কতটা সম্ভব তা নিয়েও সংশয় তৈরি হয়েছে।

ঘটনাক্রম অনুযায়ী কাকদ্বীপে ভোটার তালিকায় অস্তিত্বহীন ভোটারদের নাম ঢোকানো নিয়ে নির্বাচনী বিধিভঙ্গের অভিযোগ নিয়ে শোরগোল ওঠে রাজ্যে এসআইআর চালুর আগেই। সংশ্লিষ্ট ইআরও-কে শো-কজ করে দোষী প্রমাণিত করা হয এবং তাঁকে সাসপেন্ড করে এফআইআর রুজুর জন্য সংশ্লিষ্ট ডিইও-কে নির্দেশ দেয় কমিশন। নির্বাচনী কাজ থেকে অভিযুক্তকে সরানো হলেও কমিশনের বাকি নির্দেশ অদ্যাবধি কার্যকর হয়নি। এরপর বারুইপুর পুর্ব, ময়না, রাজারহাট-গোপালপুর ও নন্দকুমার বিধানসভা এলাকায় একই অভিযোগ উঠলেও কমিশনের এফআইআরের নির্দেশ কার্যকর হয়নি। রাজ্যের প্রাক্তন মুখ্যসচিব মনোজ পন্থকে একাধিকবার চিঠি দিয়ে, দিল্লিতে তলব করেও রাজ্য প্রশাসনকে বাগে আনতে পারেনি কমিশন। মনোজবাবু মুখ্যসচিবের পদ থেকে সরে যেতেই পুর্ব মেদিনীপুর ও দক্ষিণ ২৪ পরগণার ডিইও-দের কমিশন অভিযুক্ত ইআরও এবং এইআরও-দের বিরুদ্ধে এফআইআর দায়ের করে ডিসিপ্লিনারি অ্যাকশন চালু করার নির্দেশ দেয়। কিন্তু যথাযথভাবে তাও পালন করা হয়নি। অবশেষে সম্প্রতি রাজ্যের নতুন মুখ্যসচিব নন্দিনী চক্রবর্তীকে তদন্তের গাফিলতি উল্লেখ করে এবং নতুন করে কমিশনের নির্দেশ পালনের জন্য বল হয়। গত ২৪ জানুয়ারির মধ্যে মুখ্যসচিবকে কমপ্লায়েন্স রিপোর্ট জমা দিতে বলা হয়। কিন্তু পুনর্মূষিক ভব। ডেডলাইন পেরোলেও মুখ্যসচিব এনিয়ে কমিশনকে কোনও উত্তর দেননি তা বলাই বাহুল্য। রাজ্যে জেলাওয়াড়ি কত ভোটারকে লজিকাল ডিসক্রিপ্যান্সি ও আনম্যাপড হিসেবে শুনানি করা হয়েছে তর সম্পূর্ণ বিবরণ সহ ২৬ জানুয়ারির মধ্যে সিইও দপ্তরে জমা দেওয়ার নির্দেশ দেওয়া হলেও কোনও জেলাই মঙ্গলবার রত পর্যন্ত তা কার্যকর করেনি। ফলে এসআইআর শুনানি পর্ব নিয়ে অস্বস্তি বেড়েছে রাজ্য সিইও দপ্তরের। সম্প্রতি বসিরহাট ২ নম্বর ব্লকের বিডিও তথা এইআরও-কে ভোটার তালিকা তৈরির কাজে নিয়ম ভঙ্গের জেরে সাসপেন্ড ও এফআইআর করার নির্দেশ নির্বাচন কমিশন। ৪৮ ঘণ্টার মধ্যে নির্দেশ কার্যকর করে কমিশনকে কার্যকরী রিপোর্ট পাঠানোর নির্দেশ দেওয়া হয় মহকুমা শাসককে। কমিশনের সেই নির্দেশ কার্যকর করা হয়নি। এছাড়াও কমিশনের বিধি নিয়ম ও শাস্তির হুঁশিয়ারি তোয়াক্কা না করে সিইও দপ্তর সহ রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে বিএলও-দের বিক্ষোভ, কাজে যোগ না দেওয়া এবং নির্বাচনী বিধির পরিপন্থী কাজ করা সবই হয়েছে প্রকাশ্যে। বহুতলে ভোটের বুথ কড়া নিয়েও কমিশন রাজ্য সংঘাত চরমে ওঠে। অনেক কাঠ খড় পুড়িয়ে রাজ্যে ৬৯ টি বহু দলের একটি তালিকা কমিশনে পাঠানো হলেও তা নিয়ে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত কি হবে তাতেও রয়েছে ধোঁয়াশা। সব মিলিয়ে নির্বাচনী বিধি ভঙ্গের ক্ষেত্রে রাজ্য প্রশাসনের মুখ্য সচিব থেকে মহকুমা শাসক পর্যন্ত আধিকারিক কম একপ্রকার গুরুত্তই দেননি বলে অভিযোগ উঠেছে। যদিও প্রতিটি ক্ষেত্রে সংবিধান দ্বারা বিধিবদ্ধ নির্বাচন কমিশন সংবিধানের অনুচ্ছেদ ৩২৪, ১৯৫০ সালের ভারতীয় জনপ্রতিনিধিত্ব আইন এবং ১৯৬০ সালের নির্বাচিত নিবন্ধীকরণ আইনের শাস্তির সুপারিশ উল্লেখ করে কড়া ভাষায় রাজ্য প্রশাসনকে জানিয়েছিল।
তবুও কেন কমিশনের নির্দেশ অমান্যে রাজ্য প্রশাসনের এই ” বেপরোয়া ” মনোভাব নিয়ে বিস্মিত
রাজ্যের ভোটার থেকে পদস্থ আধিকারিকরাও। নির্বাচন কমিশনের মত সাংবিধানিক সংস্থার নির্দেশ পালনের ক্ষেত্রে এর আগে কোনও নির্বাচনে কমিশনকে এত “গুরুত্বহীন” মনে হয়নি বলে জানিয়েছেন আধিকারিকরাই।

নির্বাচনী বিজ্ঞপ্তি জারি না হলেও কমিশন রাজ্য সরকারের কর্মীদের কিভাবে শাস্তি সুপারিশ করতে পারে তা নিয়ে ইতিমধ্যেই প্রশ্ন তুলেছে রাজ্য সরকার। যদিও ভোটার তালিকা সংক্রান্ত কাজে সারাবছরই রাজ্য সরকারি কর্মী যারা কমিশনে ডেপুটেশনে কাজ করেন তারা কমিশনের নির্দেশ পালনে বাধ্য বলে একাধিকবার জানিয়েছে কমিশন। এ ব্যাপারে সিইও মনোজ কুমার আগরওয়াল এর স্পষ্ট বক্তব্য
” কমিশনের নির্দেশ মানতে বাধ্য রাজ্য। সংবিধানেই তা নির্দিষ্ট করা আছে। তবে এ বিষয়ে যা বলার তা কমিশন বলবে। সিইও শুধুমাত্র ডাক বাক্সের ভূমিকা পালন করে।” যেহেতু নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় রাজ্য সরকারের মেকানিজমই মূল ভিত্তি এই পরিস্থিতিতে সুষ্ঠুভাবে এসআইআর প্রক্রিয়া সম্পূর্ণ করা এবং স্বচ্ছ ভোটার তালিকা তৈরি এবং নিরপেক্ষভাবে নির্বাচন পরিচালনা করতে যথেষ্ট চ্যালেঞ্জের মুখে পড়তে হবে নির্বাচন কমিশনকে তা মনে করছেন কমিশনের আধিকারিকরাই।

Share with