বিশেষহেডলাইন

কমিশনের খামখেয়ালিপনায শুনানি পর্ব “নরক যন্ত্রণা “, বক্তব্য কমিশনের অন্দরে

 

সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়

একের পর এক নতুন গাইডলাইন, অথচ প্রথম থেকেই নেই কোন সুনির্দিষ্ট পরিকল্পনা বা সুনির্দিষ্ট নোটিফিকেশন। রাজ্যে
এসআইআর করা হবে তা নিয়েও যেমন কোন নির্দিষ্ট নোটিফিকেশন নেই তেমনি এসআইআর শুনানি পর্ব সুনির্দিষ্টভাবে কি পদ্ধতিতে হবে তা নিয়েও কমিশনের পক্ষ থেকে কোন গাইডলাইনই দেওয়া হয়নি। বরং ইআরও অথবা এইআরও দের ‘ পার্সোনাল ইন্টারপ্রিটেশন ‘ বা
‘ ব্যক্তিগত ব্যাখ্যা ‘ কে গুরুত্ব দিয়ে সেই অনুযায়ী পরিস্থিতি বুঝে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা বারবার জানানো হয়েছে কমিশন বা সিইও দপ্তরের পক্ষ থেকে। যখনই কোনও পদ্ধতি নিয়ে জটিলতা তৈরি হয়েছে তখনই কমিশনের নির্দেশে নতুন গাইডলাইন বা নির্দেশ ডিইও-দের পাঠিয়েছে সিইও দপ্তরের কর্তারা। আর এখানেই বেধেছে বিপত্তি। সরকারি সিদ্ধান্তের ক্ষেত্রে কোন একজন দায়িত্বপ্রাপ্ত সরকারি কর্মীর ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত বা মনোভাবকে গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে কেন ? গোটা দেশে নির্বাচনী এসআইআর পদ্ধতি যেহেতু অভিন্ন হওয়ার কথা সেক্ষেত্রে ব্যক্তিগত সিদ্ধান্ত বা পছন্দ-অপছন্দের বিষয়টি গুরুত্ব পেলে অভিন্ন নীতি বা পদ্ধতি কতটা বজায় রাখা সম্ভব হবে তা নিয়েও আধিকারিক মহলে প্রশ্ন উঠেছে। বিভিন্ন প্রক্রিয়ার সুনির্দিষ্ট পদ্ধতি নিয়ে কমিশন আগাম কোনও গাইডলাইন পাঠায়নি কেন ? এনিয়ে প্রশ্ন উঠেছে কমিশনের অন্দরেই।
পরিস্থিতি অনুযায়ী সিইও দপ্তর থেকে চিঠি পাঠিয়ে ডিইও-দের গাইডলাইন পাঠাচ্ছেন পদস্থ আধিকারিকরা। সেখান থেকে নির্দেশ পাঠিয়ে দেওয়া হচ্ছে সংশ্লিষ্ট ইআরও-দের। ফলে প্রক্রিয়ার মাঝপথে নতুন পদ্ধতি নেওয়া হচ্ছে অথবা ‘ পার্সোনাল ইন্টারপ্রিটেশন ‘ কার্যকর করাতে গিয়ে বেশ কিছু ক্ষেত্রে বৈষম্যের অভিযোগ উঠছে। আর নিত্যনতুন গাইডলাইনের জেরে বিএলও থেকে ইআরও-এইআরও এবং ভোটাররাও বিভ্রান্ত। তেমনি বিরক্ত কমিশনের পদাধিকারীরাও। সবমিলিয়ে ভোটার থেকে ভোটকর্মী এমনকি আধিকারিকরাও শুনানি পর্বের ‘ হ্যাপা ‘-কে
” নরক যন্ত্রণা ” বলে উল্লেখ করছেন। পদস্থ আধিকারিকদের একাংশের মতে কমিশনের এই খামখেয়ালিপনার জেরেই আসন্ন নির্বাচনে রাজ্যের শাসকদল তৃণমূল কংগ্রেসের ভিত শক্ত হচ্ছে। যে কারণে গত এক সপ্তাহে লাগাতার রাজ্যের শাসকদলের নেতা-মন্ত্রীরা সিইও দপ্তরে এসে নানা ইস্যুতে স্মারকলিপি দেওয়ার পরিকল্পনা নিয়েছে। একদিকে যখন কমিশনের পদক্ষেপকে সমর্থন করে বিজেপির পক্ষ থেকে বিবৃতি দেওয়া হচ্ছে তখন সাধারণ ভোটার বা মানুষদের এই হয়রানির কথা বারবার কমিশনের কাছে তুলে ধরে নিজেদের জনসমর্থন বাড়িয়ে নেওয়ার সুযোগ পাচ্ছে তৃণমূল। রাজনৈতিক সংবেদনশীল পশ্চিমবঙ্গে কমিশনের এই আচরণকে
” তুঘলকি রাজত্ব ” বলেও কটাক্ষ করছেন আধিকারিকরাই।

বস্তুত, এনুমারেশন থেকে শুরু এবার এসআইআর শুনানি নিয়েও বিতর্ক-বিক্ষোভ অব্যাহত। শুধু রাজনৈতিক দলগুলোই নয় শুনানির পদ্ধতি এবং নতুন নতুন গাইডলাইন নিয়ে বিড়ম্বনায় পড়তে হচ্ছে সাধারণ ভোটার থেকে কমিশনের আধিকারিক ও কর্মীদেরই। এনুমারেশন পর্বে বিএলও-রা দিনের পর দিন যে অভিযোগ তুলেছিলেন শুনানি পর্বেও সেই একই অভিযোগ বিএলও সহ ইআরও এবং এইআরও এমনকি শুনানিতে আসা ভোটার থেকে নির্বাচন কর্মীদেরও। কমিশন নিজে প্রথম থেকে শুনানির পদ্ধতি থেকে কারা কারা শুনানি টেবিলে হাজির থাকবেন তা নিয়ে নির্দিষ্টভাবে কোনও নোটিফিকেশন বা গাইডলাইন দেয়নি। ফলে শুনানি টেবিলে বিএলএ-রা কেন থাকবেন না তা নিয়ে যেমন জটিলতা তৈরি হয়েছে তেমনি ভোটার ও নির্বাচন কর্মীদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি সৃষ্টি হচ্ছে। ৮৫ ঊর্ধ্ব ভোটারদের বাড়িতে গিয়ে শুনানি করা হবে অথবা গুরুতর অসুস্থ গর্ভবতী মহিলা বা বিশেষভাবে সক্ষমদের ক্ষেত্রেও পরিস্থিতি বিবেচনা করে শুনানি কেন্দ্রে যাওয়ার ব্যাপারে অব্যাহতি দেওয়া হবে। প্রথম থেকে এ ধরনের সিদ্ধান্ত বা কোন বিজ্ঞপ্তি প্রকাশ করা না হলেও শুনানি শুরু হওয়ার পর একটি চিঠি আকারে সমস্ত ডিইওদের জানানো হয়। ফলে তা নিয়ে বিভ্রান্তি চরমে ওঠে। দুদিন আগেই বিএলওদের সিইও দপ্তরের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে শুনানি পর্বের কাজ চালানোর পাশাপাশি ৬, ৭ এবং ৮ নম্বর ফোন ভোটারদের থেকে সংগ্রহ করার জন্য সপ্তাহে অন্তত চারদিন ভোটের বুথে হাজির থাকতে হবে । শুনানি পর্ব শুরু হওয়ার আগে বা শুরু হওয়ার পর এ নিয়ে কোন উচ্চবাচ্য করেনি কমিশন বা সিও দপ্তর । মঙ্গলবার সিইও দপ্তরে জ্ঞানেশ ভারতীর সঙ্গে সাত জেলার আট ডিইও-র বৈঠকে নির্দেশ দেওয়া হযেছে একদিনের মধ্যে যেসব বহুতলে বুথ তৈরি করা যাবে তার তালিকা পাঠাতে। এক্ষেত্রে ভোটার সংখ্যার তারতম্য ঘটেছে একাধিকবার। প্রথমে ছিল ৮০০, পরে তা কমিয়ে ৫০০ তারও পরে ৪০০ মঙ্গলবার আবার ৩০০ তে নামিয়ে আনা হয়েছে। সবধরণের তালিকাই প্রস্তুত রাখতে বলা হয়েছে। বলা হয়েছে শুনানি শেষ হওয়া চূড়ান্ত ভেরিফিকেশন লগ ইন শুধুমাত্র ডিইও-দের হাতেই থাকবে। লক্ষ লক্ষ নথির ভেরিফিকেশন যদি ডিইও বা ডিএম-দের করতে হয় তাহলে প্রশাসনিক কাজ ও অন্যান্য কাজের সঙ্গে তাদের উপর বাড়তি চাপ বাড়বে। এই কথা জেলাশাসকরা বৈঠকে তুলতেই জ্ঞানেশ ভারতীর পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে বিকল্প কিছু করা যায় কিনা সেটা পরে ভাবা হবে। এখন এইভাবেই কাজ করতে হবে। অর্থ্যৎ এক্ষেত্রেও সুনির্দিষ্ট কোনও রাস্তা দেখাতে পারেনি কমিশন। কমিশন সূত্রে খবর, ২০০২ এ যাদের নাম রয়েছে অথচ ম্যাপিং-এ নাম ওঠেনি, তাদের শুনানিতে ডাকার কথা ছিল। যদিও শেষ পর্যন্ত মঙ্গলবারের বৈঠকে সিদ্ধান্ত বদলে কমিশন জানায় এই ধরনের ভোটারদের শুনানিতে ডাকার প্রয়োজন নেই। বিএলও-রাই এটা ঠিক করে দেবেন। জানা যাচ্ছে, এই ধরণের ভোটারের সংখ্যা কমবেশি চার লক্ষ। নিত্য নতুন গাইডলাইনে বদল বা নতুন নতুন নির্দেশ গোটা নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় যেমন বিভ্রান্তি বাড়িয়েছে তেমনি বিরক্ত নির্বাচনকর্মীরাও। এমতাবস্থায় নির্দিষ্ট এনুমারেশন থেকে শুনানি পর্বে যে জটিলতা সৃষ্টি হযেছে তার জন্য কমিশনকেই কাঠগড়ায় তুলছেন পদস্থ আধিকারিকরা। এই একই অভিযোগ তুলে দেশের মুখ্য নির্বাচন কমিশনারকে আগেই চিঠি দিয়েছেন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। যেখানে তিনি বহুতলে বুথ তৈরির সিদ্ধান্তেও বিরোধিতা জানিয়েছিলেন।

Share with