বিশেষহেডলাইন

৬০ লক্ষের পরিচয় ও ভোটাধিকারে সংশয় !! ‘থার্ড আম্পায়ার’ দেখিয়ে ৬০ লক্ষকে ধোঁয়াশায় রেখেছে কমিশন??

সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়

আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে বিচারকদের সিদ্ধান্তের অপেক্ষায় থাকা ৬০ লক্ষ ভোটারের নাম ছাড়াই আগামী ২৮ ফেব্রুয়ারি প্রকাশিত হতে চলেছে চুড়ান্ত ভোটার তালিকা।
চুড়ান্ত ভোটার তালিকার সঙ্গে একটি সংযোজন হিসেবে ৬০ লক্ষ ৬ হাজার ৬৭৫ জন ভোটারের তালিকা থাকবে যাদের নামের পাশে বিচারাধীন বলে উল্লেখ থাকবে।
যদিও এই ৬০ লক্ষ ভোটার কারা? এদের মধ্যে কতজন লজিকাল ডিসক্রিপ্যান্সির অন্তর্ভুক্ত অথবা কতজন আনম্যাপড তা যেমন নিশ্চিত নয় তেমনি যে ৪ লক্ষ ৯৮ হাজার ভোটার শুনানিতে গরহাজির ছিলেন অথবা যে ৪ লক্ষ ৪৪ হাজার ৯৭০ ভোটার অযোগ্য বলে বিবেচিত হয়েছিলেন কিংবা গত ১৪ ফেব্রুয়ারির মধ্যে যে ভোটারদের নথি আপলোড করতে পারেননি ইআরও-রা তাঁরাও কি এই ৬০ লক্ষের অন্তর্ভুক্ত ? এই প্রশ্নের সদুত্তর নেই কমিশনের কর্তাব্যক্তিদের কাছেই। কার্যত ৬০ লক্ষ ভোটারের পরিচয় বা ক্যাটেগরি এবং তাঁদের অতিরিক্ত তালিকায় অন্তর্ভুক্তির কারণ সম্পর্কে যাবতীয় সিদ্ধান্ত নির্বাচন কমিশনেরই কুক্ষিগত তা মেনে নিয়েছেন পদস্থ কর্তারাই। ফলে কমিশনের পদাধিকারী থেকে সাধারণ ভোটার সকলেরই পাখির চোখ এখন ২৮ ফেব্রুয়ারির চূড়ান্ত ভোটার তালিকায়।
স্বাভাবিকভাবেই চুড়ান্ত তালিকা পরবর্তী যে অতিরিক্ত তালিকা প্রকাশিত হবে সেখানে এই ৬০ লক্ষের মধ্যে কত ভোটার ভোটাধিকার প্রয়োগ করতে পারবেন তা নিয়েও ধোঁয়াশা তৈরি হয়েছে।

সুপ্রিম কোর্টের নির্দেশ অনুযায়ী ২৮ ফেব্রুয়ারি চুড়ান্ত ভোটার তালিকা প্রকাশের পর ধাপে ধাপে অতিরিক্ত তালিকা প্রকাশিত হবে যেখানে হাইকোর্ট নিযুক্ত জুডিশিয়াল অফিসাররা ৬০ লক্ষ ভোটারের নথি যাচাইয়ের মীমাংসা করে যোগ্যদের ভোটাধিকার দেবেন। যদিও এই অতিরিক্ত তালিকা প্রকাশের নির্দিষ্ট কোনও ডেডলাইন উল্লেখ নেই শীর্ষ আদালতের নির্দেশিকায়। অবশ্য হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি যত দ্রুত সম্ভব এই যাচাইকরণের কাজ সম্পূর্ণ করতে বলেছেন যাচাইকারী বিচারকদের।
আর এখানেই উঠছে প্রশ্ন!
নির্বচনী প্রক্রিয়ায় যুক্ত হওয়া বিচারকরা কত দ্রুত যাচাইয়ের কাজ সম্পূর্ণ করতে পারবেন তার উপরেই নির্ভর করছে এই ৬০ লক্ষের মধ্যে কত শতাংশ আসন্ন নির্বাচনে ভোট দিতে পারবেন। ১ কোটি ২০ লক্ষ লজিকাল ডিসক্রিপ্যান্সি এবং ৩২ লক্ষ ‘আনম্যাপড’ ভোটারদের ভোটাধিকার নিয়ে যে বিতর্ক তৈরি হয়েছিল তা নিরসনের জন্যই বিচারব্যবস্থাকে নজিরবিহীনভাবে নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় যুক্ত করার নির্দেশ দেয় সুপ্রিম কোর্ট। সেই মোতাবেক ইতিমধ্যেই ৫৩২ জন বিচারকের নাম জেলায় জেলায় পাঠিয়েছে হাইকোর্ট। বৃহস্পতিবার ওড়িশা ও ঝাড়খণ্ড থেকে ৪০০ জন বিচারক রাজ্যে আসছেন। যদিও সূত্রের খবর, এই নতুন ভূমিকায় বিচারকদের কাজের পদ্ধতি ও প্রযুক্তিগত প্রশিক্ষণ দিয়ে নির্বচনী কাজের উপযুক্ত করে তুলতে যেমন সময় লাগবে তেমনি সার্ভার সমস্যা সামলে নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে এই বিপুল মানুষের নথি যাচাই ও অতিরিক্ত কাজের চাপ নেওয়ার ক্ষমতা ইত্যাদি ফ্যাক্টরের মোকাবিলা করে বিচারকরা কতটা দ্রুতগামী হতে পারবেন তা নিয়ে সংশয়ে রয়েছেন সংশ্লিষ্ট মহল। গত ২০ ফেব্রুয়ারি সুপ্রিম কোর্ট নির্দেশ দিলেও এখনো কাজের কাজ সেরকম কিছু এগোয়নি। বরং জটিলতা কাটাতে বৃহস্পতিবার কলকাতা হাইকোর্টে রাজ্য প্রশাসন ও কমিশনকে বৈঠকে ডেকে পাঠিয়েছেন কলকাতা হাইকোর্টের প্রধান বিচারপতি। সংশ্লিষ্ট আধিকারিকদের মত, যাবতীয় পরিস্থিতি অনুযায়ী এভাবে চলতে থাকলে ৬০ লক্ষ তো দূর, অর্ধেক ভোটারের নাম মনোনয়নের শেষ দিনের আগে পর্যন্ত অতিরিক্ত তালিকায় স্থান পাবে কিনা তা নিয়ে যথেষ্ট সন্দেহ থাকছে। পরিসংখ্যান অনুযায়ী, এসআইআর প্রক্রিয়ায় খসড়া ভোটার তালিকায় ৫৮ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ যাওয়ার বর্তমানে রাজ্যে রয়েছেন ৭ কোটি ০৮ লক্ষ ভোটার। তার মধ্যেই ১ কোটি ৫২ লক্ষ ভোটারের বৈধতা নিয়ে প্রশ্ন ওঠে। ২১ ফেব্রুয়ারি যাবতীয় যাচাইয়ের কাজ শেষ হয়ে যাওয়ার পর ৬০ লক্ষ ভোটারের ভাগ্য নির্ভর করছে এখন বিচারকদের দ্রুত বিচারের উপর। ফলে ভোটার তালিকা নিয়ে রাজ্য কমিশন সংঘাতে ‘থার্ড আম্পায়ার’ হিসেবে কত দ্রুত সুবিচার দিতে পারে বিচারব্যবস্থা সেদিকেই ‘পাখির চোখ’ সংশ্লিষ্ট সব মহলের।

Share with