“মঙ্গলে উষা “‘, আঁধার জীবনে অধিকারের ‘আলো’ জ্বালাতে সোনাগাছিতে বিশেষ ক্যাম্প
সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়
কথায় বলে, ” ওদের ঘরের মাটি ছাড়া পুজো (দুর্গাপুজো) সম্পূর্ণ হয় না”। আর নির্বাচনী গণতন্ত্রে “ওদের” বাদ দিয়ে ভোটাধিকরের গণতন্ত্র সম্পূর্ণ করতে চায় না নির্বাচন কমিশন। সমাজ
“ওদের” অচ্ছ্যুৎ করলেও ভোটার তালিকায় যোগ্যদের ভোটারের মর্যাদা দিতে কোনও কার্পণ্য করতে চায় না কমিশন। এই লক্ষ্যমাত্রাকে সামনে রেখেই মঙ্গলবার সকাল ১১ টা থেকে বিকেল ৪টে পর্যন্ত উত্তর কলকাতার সোনাগাছির যৌনপল্লিতে হচ্ছে এনুমারেশন ও হিয়ারিং সংক্রান্ত বিশেষ ক্যাম্প। রাজ্য সিইও দপ্তরের উদ্যোগে এবং কলকাতা উত্তরের ডিইও দপ্তরের তত্ত্বাবধানে যৌনকর্মী ও তাঁদের সাবালক সন্তানদের ভোটাধিকার রক্ষায় এই বিশেষ ড্রাইভ। নিজের বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করে সিইও এই উদ্যোগ নিয়েছেন যিনি নিজে সকাল ১১ টা থেকে সাড়ে ১১ টার মধ্যে ক্যাম্পে উপস্থিত থেকে গোটা কাজের তদারকি করবেন। মঙ্গলবার সোনাগাছির যৌনপল্লির দুটি ওয়ার্ড ১৮ ও ২৬-এর ১৪ টি পার্ট বা বুথের জন্য তিনটি বিশেষ ক্যাম্পের আয়োজন করা হয়েছে। একটি দুর্গাচরণ মিত্র স্ট্রিটের কদমতলা মিলন সংঘে, দ্বিতীয়টি অবিনাশ কবিরাজ স্ট্রিট ও দুর্গাচরণ মিত্র স্ট্রিটের সংযোগস্থলের শীতলা মন্দিরে এবং আরও একটি হবে বিডন স্কয়ারের কলকাতা পুরসভার কমিউনিটি হল ‘ঘরে বাইরে’-তে। নির্বাচন কমিশন সূত্রে খবর, গোটা দেশের মধ্যে এশিয়ার সবচেয়ে বড় রেডলাইট এলাকা বলে খ্যাত সোনাগাছিতেই প্রথম এই ধরনের বিশেষ ক্যাম্প করা হচ্ছে। সিইও মনোজ কুমার আগরওয়াল জানিয়েছেন ” আমরা চাই যেন কোনও সঠিক ভোটার ভোটার তালিকা থেকে বাদ পড়ে না যান”। সিইও জানিয়েছেন, শুধু যৌনকর্মীরাই নয় রাজ্যের সব বৃদ্ধাশ্রম, অনাথ আশ্রম এমনকি প্রতিবন্ধী সংগঠনের কাছেও এনুমারেশন ফর্ম পাঠাতে জেলায় জেলায় নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। প্রতিটি ক্ষেত্রেই ‘স্পেশাল কেস’ হিসেবে গণ্য করে এনুমারেশন পুরণ করতে হবে।
মূলত, উত্তর কলকাতার শ্যামপুকুর বিধানসভার অন্তর্গত সোনাগাছি যৌনপল্লীতে প্রায় সাত হাজার এ ধরনের ভোটার রয়েছেন যাদের মধ্যে অনেকেরই এখনও পর্যন্ত ভোটার কার্ড নেই। অথবা ভোটার কার্ড থাকলেও তাদের বাবা-মা অথবা পূর্বপুরুষদের কোন পরিচয় যেমন নেই তেমনি ২০০২ সালের ভোটার তালিকায় তাদের নাম নেই। তার থেকে বড় সমস্যা হয়ে দাঁড়িয়েছে সদ্য ১৮ পেরোনো নতুন প্রজন্মের ভোটার যারা নতুনভাবে ২৬ এর নির্বাচনে ভোটার হতে আগ্রহী, তাদের পিতৃপরিচয় বা পূর্বপুরুষের পরিচয় নিয়ে জটিলতা থাকায় আদৌ তারা ভোটার তালিকায় নাম তুলতে পারবেন কিনা তা নিয়ে সন্দেহ দানা বেঁধেছিল।
বহু যৌনকর্মীর ক্ষেত্রে পিতৃপরিচয় বা পূর্বপুরুষদের পরিচয় দেওয়ার ক্ষেত্রে প্রতিবন্ধকতা রয়েছে। নাম গোত্রহীন বহু এমন ভোটার এই যৌনপল্লীতে রয়েছেন যারা তাদের প্রকৃত পরিচয় গোপন রাখতে চান। নির্বাচন কমিশন নির্দেশিত এস আই আর প্রক্রিয়া তাদের ভোটদানের গণতান্ত্রিক অধিকারে বাস্তব সমস্যার মুখে দাঁড় করিয়েছে। স্বাভাবিকভাবেই বিএলও-দের মাধ্যমে যথাযথভাবে এনুমারেশন ফর্ম পুরণ করার ক্ষেত্রে নিজেদের আড়ালেই রেখেছিলেন যৌনপল্লির যোগ্য ভোটাররা।
এনুমারেশন ফর্ম সংক্রান্ত সমস্যার কথা জানিয়ে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক মনোজ আগরওয়ালকে চিঠি দিয়েছিল যৌনকর্মী এবং তাঁদের সন্তানদের জন্য কাজ করা তিনটি সংগঠন- ‘সোসাইটি অফ হিউম্যান ডেভেলপমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল অ্যাকশন’, ‘উষা মাল্টিপার্পাস কো-অপারেটিভ সোসাইটি লিমিটেড’ এবং ‘আমরা পদাতিক’। চিঠির প্রত্যুত্তরে রাজ্যের সিইও দপ্তর যৌন কর্মীদের আশ্বস্ত করে জানিয়েছিল, হিয়ারিং-এর সময়ে যৌন কর্মীদের জন্য বিশেষ হিয়ার ক্যাম্পের ব্যবস্থা করা হবে। প্রয়োজনে সিইও নিজের বিশেষ ক্ষমতা প্রয়োগ করে ক্যাম্পের উদ্যোগ নেবেন বলেও আশ্বাস দিয়েছিলেন।
২০০৭ সালে তৎকালীন সিইও দেবাশিস সেন সোনাগাছির যৌনপল্লীর ভোটারদের জন্য ভোটার কার্ড ইস্যু করার ব্যবস্থা করেছিলেন। পরে ২০১০ এর কলকাতা কর্পোরেশন নির্বাচনের সময় বিশেষ ড্রাইভের মাধ্যমে সোনাগাছির যোগ্য ভোটারদের ভোটার কার্ডের ব্যবস্থা করলেও পরিচয় গোপন রাখার তাগিদে বহু ভোটার আড়ালেই থেকে যান। অবশ্য, ২০০২ সালের ভিত্তি বর্ষের সময় এই ভোটারদের ভোটার কার্ড ছিল না বললেই চলে। আর সেখানেই এবারের এসআইআর প্রক্রিয়ায় বেধেছে বিপত্তি, সোনাগাছির যৌনকর্মীদের মধ্যে ভোটাধিকার হারানোর আশঙ্কা তৈরি হয়েছে।
তবে নির্বাচন কমিশনের সবুজ সঙ্কেত নিয়ে সিইও দপ্তরের এই বিশেষ উদ্যোগ যৌনপল্লির আশঙ্কা দূর করতে পারবে বলে মনে করছে যৌনকর্মীদের জন্য কাজ করা সংগঠনগুলিও।

