হেডলাইন

নির্বাচনী বঙ্গে ভূত-ভুতুড়ে তাড়াতে এসআইআরে যেন ‘যমালয়ে জীবন্ত মানুষ’ !

 

সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়

ভানু বন্দ্যোপাধ্যায় অভিনীত হাস্যরসাত্মক ‘যমালয়ে জীবন্ত মানুষ’ সিনেমাটির কথা নিশ্চয়ই মনে আছে। যেখানে মর্তের জীবন্ত মানুষ নরকে পৌঁছে যমরাজের কাছে জানতে চাইছেন জীবন্ত হয়েও কেন তাঁকে নরকে তুলে আনা হয়েছে? যেরকম খুশি অ্যারেস্ট করে ধরে এনে তাকে অভিযুক্ত হিসেবে কাঠগড়ায় তুলে কারাগার বন্দি করার পর দোষী সাব্যস্ত না হলে ছোট্ট দুঃখ প্রকাশ করে ছেড়ে দেওয়া হবে ! এটাই কি নরকের নীতি? যুক্তির প্রত্যুত্তরে খেই হারিয়ে যমরাজ উত্তর দিয়েছিলেন “মানছি এটা ভুল, মস্ত বড় ভুল”। আর এই ভুলের খেসারত হিসেবে দেবলোকে অবাধ বিচরণের সুযোগ পেয়েছিলেন পর্দার সিধু।

সেলুলয়েডে মর্তের এই কঠোর বাস্তবের প্রতিচ্ছবি যেন বঙ্গের এসআইআর-এ। ভূত-ভুতুড়ে ধরতে এখন চোর-পুলিশ খেলা চলছে কমিশন ও নির্বাচন কর্মী বা বিএলও-দের মধ্যে। যমালয়ে যেমন জ্যান্ত মানুষ ধরে এনে মৃতের তালিকায় সংখ্যা বাড়ানোর খেলা, ঘুষের টোপে শাস্তি অর্ধেক, তেমনি নির্বাচনী বঙ্গে মৃত মানুষকে বাঁচিয়ে রেখে ভোটের পালে ভুতুড়ে ভোটার বাড়ানোর কৌশল, ক্ষমতা কায়েম করার সুচতুর প্রয়াস। আর এই কৌশল ভেস্তে দিতেই সেলুলয়েডে যেমন যমে-মানুষে টানাটানি, আদরের মৃত ভোলা ষাঁড়ের লম্ফঝম্ফে নরকে জীবন্ত মানুষের প্রাণান্তকর অবস্থা, বাস্তবের মাটিতেও তেমনি কমিশন-বিএলও চাপানউতোর। জেলায় জেলায় গত ২৩ বছরে ২,২০৮ বুথে একজন ভোটারের মৃত্যু না হওয়া বা বিয়ে অথবা ঠিকানা বদলের জন্য কেউ স্থানান্তর হননি বলে বিএলও-দের রিপোর্ট। রিপোর্টকে মান্যতা না দিয়ে পর্দার যমরাজের মতই ” মস্ত বড় ভুল ” মনে করে পাল্টা পাইক-বরকন্দাজ ও আধুনিক প্রযুক্তিকে ‘ ভূত ‘ ধরার কাজে লাগিয়েছে কমিশন। তার জেরেই ২৪ ঘন্টা পেরোতে না পেরোতেই ‘লাগ ভেল্কি লাগ’। একের পর এক জেলায় হু হু করে খোঁজ মিলছে মৃত, স্থানান্তরিত, অনুপস্থিত অথবা ভুতুড়ে ভোটারের। যে ২,২০৮ বুথে অসংগৃহীত গণনাপত্র শূন্য বলে জানানো হয়েছিল সেই তালিকায় এখন বুথ সংখ্যা শূন্যের দিকে দ্রুত এগোচ্ছে। অর্থাৎ, একের পর এক যাচাই পদ্ধতির জেরে ওই বুথগুলি মৃত অথবা স্থায়ীভাবে স্থানান্তরিত ভোটাররাই আচমকা নিজেদের সম্বন্ধে সঠিক তথ্যের জানান দিতে শুরু করেছেন ! যার ফলে অসংগৃহীত গণনাপত্র নেই এরকম বুথের সংখ্যা হু হু করে কমতে শুরু করেছে। এখানেই শেষ নয়, নির্বাচন কমিশনের তথ্যভাণ্ডারে বঙ্গের এসআইআরে এমন তথ্য মিলছে যেখানে বহু বুথে গত ২৩ বছরে এমন কোনও ভোটার নেই যিনি ২০২৫ সালের ভোটার অথচ নিজে ২০০২ সালে ভোটার ছিলেন না। অর্থাৎ সেই বুথগুলোতে কোনও বাবা-মায়ের সন্তানের বয়স চল্লিশ বা তার ঊর্ধ্বে নয়। অর্থাৎ ওই বুথগুলোতে ভোটার ম্যাপিং করতে গিয়ে কোন সেলফ ভোটারের অস্তিত্ব খুঁজে পাননি বিএলও-রা। ভোটার ম্যাপিংয়ের কাজে ‘সেলফ ভোটার’ (যাদের ২০০২ তালিকায় নাম আছে) ও ‘প্রিজনি ভোটার’ ( যাদের ২০০২ তালিকায় নাম নেই) নিয়েও যথেষ্ট অস্বস্তি বাড়িয়েছে কমিশনের। ফলে
ফের ‘ চিত্রগুপ্তের তালিকা ‘ খতিয়ে দেখার কাজ শুরু। এই টানাটানির জেরে যে তথ্যগুলো হাতে আসছে তাতে ‘ঠগ বাছতে গা উজাড়’ অবস্থা। তা বুঝেই কমিশন বঙ্গের এসআইআর নিয়ে বাড়তি সতর্কতা নিয়েছে। একদিকে যেমন সিইও দফতরকে নিরাপদ জায়গায় স্থানান্তরে তৎপর হয়েছে কমিশন তেমনি সিইও দপ্তরে কমিশনের আধিকারিকদের এসআইআর প্রক্রিয়ায় যুক্ত করা হয়েছে। জেলায় জেলায় ভোটার তালিকাকে নির্ভুল করতে কেন্দ্রীয় পর্যবেক্ষকদের নিয়োগ করা হয়েছে। মাথার উপর রয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত সিনিয়র আইএএস বিশেষ পর্যবেক্ষকও। যিনি বর্তমান সিইও-র ব্যাচমেট তথা বন্ধুও বটে। দুই বন্ধুর তত্ত্বাবধানে যাবতীয় মেশিনারি ও প্রযুক্তি কাজে লাগিয়ে বঙ্গের এসআইআর প্রক্রিয়ায় নির্ভুল ও স্বচ্ছ ভোটার তালিকা তৈরিতে বদ্ধপরিকর নির্বাচন কমিশন। তবুও কি শেষরক্ষা হবে ? এ প্রশ্ন অবান্তর নয়। এখনও পর্যন্ত রাজ্যে মৃত, ভুয়ো, স্থানান্তরিত ও ডুপ্লিকেট মিলিয়ে নাম বাদ পড়ার সংখ্যা ৫০ লক্ষের কাছাকাছি। এসআইআর প্রক্রিয়ার পর খসড়া ভোটার তালিকায় প্রায় ৬৫ লক্ষ ভোটারের নাম বাদ গিয়েছিল বিহারে। পরিস্থিতি যেদিকে এগোচ্ছে তাতে এসআইআর শেষে বিহারকে টেক্কা দেবে পশ্চিমবঙ্গ বলে কমিশনের অন্দরে এমনটাই গুঞ্জন উঠেছে। ভূত-প্রেতের যমালয়ে গিয়ে পর্দার সিধু (ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়) যুক্তি-বুদ্ধির জোরে দেবলোকের স্বর্গসুখ পেয়েছিলেন। সেলুলয়েডের যমরাজ ন্যায়দণ্ড হাতে নিয়ে চিত্রগুপ্তদের সিস্টেম এরর মেনে নিয়ে জ্যান্ত সিধুকে (ভানু) দেবলোকে যাওয়ার অনুমতি দিয়েছিলেন।
মর্তের ভূত-ভুতুড়েদের সঙ্গে লড়াই চালিয়ে স্বচ্ছ্ব ও শান্তির মরুদ্যান উপহার দিতে পারবে কি নির্বাচন কমিশন? নজর নির্বাচনী বঙ্গে।

Share with