পরিবর্তনের পটভূমি’ সিঙ্গুর কি এখন রাজনৈতিক ডিভিডেন্ডের মাটি ? মমতার সভার আগে প্রশ্ন
সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়
মাঝে কেটে গিয়েছে কুড়ি বছর। ২০০৬ থেকে ২০২৬। কিন্তু চার ফসলী জমির উর্বর সিঙ্গুর আজও পরিবর্তনের পটভূমি। সময়ের দাবি মেনে এক সময় সিঙ্গুরের এই উর্বর ধানা জমিতে লোহা, টিন যন্ত্রাংশ দিয়ে তৈরি হয়েছিল গাড়ি কারখানার শেড। তা থেকেই শুরু হয় শিল্প-কৃষি দ্বন্দ্ব। উর্বর কৃষি জমিতে শিল্প নয় এই দাবিতে ২০০৬ সালে সিঙ্গুর আন্দোলনের ডাক দিয়েছিলেন তৎকালীন বিরোধী নেত্রী বর্তমানের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বাপ-ঠাকুরদার উর্বরা কৃষি জমি টাটাদের হাতে তুলে দিতে চাননি বহু কৃষক পরিবারও। তাদেরকে সঙ্গে নিয়েই শুরু হয় মমতার সিঙ্গুর আন্দোলন যা রাজ্যের রাজনৈতিক পালাবদলের অন্যতম পরিবর্তনের পটভূমি বলে স্বীকৃত। ইচ্ছুক-অনিচ্ছুক দুভাগে বিভক্ত হয়ে সিঙ্গুরের এই জমি আন্দোলন স্তব্ধ করে দেয় শিল্প সম্ভাবনা। আজকে যিনি দেশের প্রধানমন্ত্রী তৎকালীন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ছিনিয়ে নিয়ে যান টাটা গোষ্ঠীর ন্যানো কারখানাকে তাঁর রাজ্যে। কৃষকের অধিকার রক্ষার দাবিতে দেশজুড়ে সিঙ্গুর আন্দোলন মাইলস্টোন তৈরি করে । কিন্তু যে উর্বর কৃষি জমিতে রাজনৈতিক পালাবদলের চিত্রনাট্য তৈরি হয়েছিল সেই সিঙ্গুরে কৃষক স্বার্থ কতটা রক্ষা পেল ? শিল্প তো আগেই গেছে, কিন্তু কারখানা তৈরি করতে গিয়ে এবং আন্দোলনের জেরে সিঙ্গুরের উর্বরা কৃষিজমির অধিকাংশই আজ বন্ধ্যা। রুক্ষ জমিতে আর ফলে না শস্য-শ্যামলা ধান, উর্বরতা হারিয়ে চার ফসলি জমি কোথাও হয়েছে এক ফসলি অথবা মেনে নিয়েছে বন্ধ্যাত্বকে। সুপ্রিম কোর্ট সিঙ্গুরের জমি অধিগ্রহনকে বেআইনি বলে ঘোষণা করার পর জমি আন্দোলনের কান্ডারী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় নিজের রাজনৈতিক জয় প্রকাশ করতে গিয়ে চার ফসলী ধানা জমিতে সর্ষের বীজ ছড়িয়ে এসেছিলেন। হয়তো সেটাও একটা পরিবর্তনের সূচক। নিজের চল্লিশ বছরের রাজনৈতিক ক্যারিয়ারে মানুষের পাশে থাকাই তাঁর একমাত্র ইউএসপি এটা সগর্বে ঘোষণা করেন মমতা। সিঙ্গুরের চিত্রনাট্য বদলের পরেও অবশ্যই তিনি পাশে ছিলেন। এক সময় শোষিত লাঞ্ছিত কৃষক পরিবারের পাশে দাঁড়াতে গিয়ে নিজেও যথেষ্ট লাঞ্ছনার শিকার হয়েছিলেন এই সিঙ্গুরের মাটিতেই। ২০১১ সালে রাজনৈতিক পালাবদল ঘটিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ের ক্যাবিনেটের প্রথম সিদ্ধান্তই ছিল সিঙ্গুরের অনিচ্ছুক চাষীদের জমি ফিরিয়ে দেওয়া। তিনি কথা রেখেছিলেন, জমি ফিরিয়েও দিয়েছেন। কিন্তু সেই জমি আর চাষীর কাজে লাগেনি। তাই পরবর্তী প্রজন্ম চাষার ব্যাটা পরিচয়টাই ভুলেছে। পরিবর্তিত পরিস্থিতিকে কাজে লাগিয়ে চাষীর পরিবার খুঁজে নিয়েছে বিকল্প পেশা, কেউ হয়েছেন ব্যবসায়ী কেউবা প্রোমোটার। সিঙ্গুরকে সরকারি পরিষেবায় ভরিয়ে দিয়েছেন মমতাও। দুই টাকা কেজি দরে চাল, কৃষক বীমা, খাদ্য সাথী, লক্ষীর ভান্ডার, কন্যাশ্রী, সবুজ সাথী, বাংলার বাড়ি ইত্যাদি বহু সরকারি পরিষেবায় উল্লেখযোগ্যভাবে জড়িয়েছে সিঙ্গুরের নাম। কিন্তু যারা মমতার সঙ্গে পায়ে পা মিলিয়ে জমি আন্দোলন করে নিজেদের বংশপরম্পরায় জমি রক্ষার আন্দোলনে নেমেছিলেন সেই জমিতে আজ চাষের কাজের পরিবর্তে শিল্প চাইছেন বেড়াবেড়িয়া, ভাঙ্গাবেড়া, গোপালনগর, ঘাসের ভেড়ি অঞ্চলের বহু চাষী বা ভাগচাষীদের পরিবার। সাধের উর্বরা চার ফসলি জমি আর পেটের ভাতের যোগান দিতে পারছে না, তাই ওই জমি শিল্পের কাজেই লাগানো হোক চাইছেন সেই অনিচ্ছুকরাই। জমি আন্দোলনে বিরোধী নেত্রী পাই পা মিলিয়ে ছিলেন তাদের অধিকাংশই পরিবর্তনের রাজ্যে বঞ্চিত রয়ে গেছেন, ফুলে ফেঁপে উঠেছেন স্থানীয় কিছু ভুঁইফোর নেতা। এটাও কিন্তু একটা পরিবর্তন। সেদিন যিনি ছিলেন সিঙ্গুরের “চাষার ব্যাটা” আজ তিনিই রাজ্যের মন্ত্রী। সিঙ্গুর আন্দোলনে যারা শহীদ হয়েছিলেন তাদের স্মৃতি সৌধ তৈরীর কাজ আজও অসম্পূর্ণ রয়ে গেছে। কয়েকদিন আগেই সিঙ্গুরের এই পরিবর্তনের জমিতে এসেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। যিনি সিঙ্গুর থেকে টাটা ন্যানো কারখানা গুজরাটে সানন্দে নিয়ে গিয়েছেন। সিঙ্গুরবাসীর আশা ছিল, মোদির মুখে সিঙ্গুরের বন্ধা জমিতে শিল্প তৈরির বার্তা পাবেন, কিন্তু সে গুড়ে বালি। এবার সিঙ্গুরের মাটিতে ফের পা রাখছেন ২০০৬ এর অগ্নিকন্যা রাজ্যের বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। বাংলার বাড়ি সহ বিভিন্ন সরকারি প্রকল্পের ঘোষণা করবেন মুখ্যমন্ত্রী সিঙ্গুরের মাটি থেকে । রাজ্যের মন্ত্রী তথা সিঙ্গুর আন্দোলনের অন্যতম সৈনিক বেচারাম মান্না জানিয়েছেন, সিঙ্গুরে মোদীর সভার পাল্টা মমতার সভাকে কেন্দ্র করে মিনি ব্রিগেড তৈরি হবে। কিন্তু সিঙ্গুরের দিশেহারা মানুষ এখন শিল্পের মুখ দেখতে চায়, কর্মসংস্থানের সুযোগ সৃষ্টি হোক এই পরিবর্তনের পটভূমিতে এটাই এখন মূখ্য। মোদির পাল্টা মিনি ব্রিগেড মানে তো সেই রাজনৈতিক রেষারেষি, রাজনৈতিক ডিভিডেন্ড বা ফললাভের চেষ্টা। এটাও তো আর এক পরিবর্তন । সিঙ্গুর বাসীর চাওয়া-পাওয়ার গুরুত্ব কি তবে কমেছে পরিবর্তনের কান্ডারীর কাছে ? সিঙ্গুর কি এখন শুধুই ভোট রাজনীতির ফসল ? সভার পর মমতার সভা নিয়ে সেই আশা-আশঙ্কার দোলাচলে রয়েছে পরিবর্তনের সিঙ্গুর। অবশ্য পরিবর্তনের পটভূমিতে পরিবর্তনের কাণ্ডারি কি বার্তা দেন সেদিকেই মুখিয়ে রয়েছে উর্বরা থেকে বন্ধ্যা হয়ে যাওয়া সিঙ্গুরের মাটি।

