বিশেষ

প্রতিবাদ, অভিমান ও একাকিত্ব স্ববিরোধ মিলিয়ে কালান্তরের স্বর সুচিত্রা

 

সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়

নিজের গহন প্রভাব বিস্তার করে কলকাতার রবীন্দ্রগানের জগত মনোপলাইজ করে রেখেছিলেন সুচিত্রা মিত্র। আমবাঙালির সেলাম পাওয়া জর্জ বিশ্বাসের সংগীতকে রুদ্ধ করার রাজনীতিতেও জড়িয়ে তাঁর নাম। সুচিত্রা মিত্র মানেই
একটু একটু করে অনেকগুলি বাইনারি। রবীন্দ্রগান অথচ চুল ছাঁটা (এমনকি নবনীতা দেবসেনও খেদ প্রকাশ করেন একটি লেখায়, তাঁর প্রিয় গজুদি এলো চুল ছেঁটে ফেলায়। এলো খোঁপায় আর ফুল জড়ানো রূপটি দেখা যাবে না। তাঁর আশ্রমঘেঁষা চোখে সয়ে নিতে সময় লাগে এই ছোটো চুল)। রবিঠাকুরের পূজা পর্যায়ের গহীন গান এবং গণনাট্যের গান। এটা সম্ভবত দ্বিতীয় বাইনারি। নিন্দা চরমে উঠল যখন সলিল চৌধুরীর কথা ও সুরে রোম্যান্টিক ‘কৃষ্ণকলি’ গানের যুদ্ধ-উত্তর আধুনিক জবাব ‘সেই মেয়ে’ রেকর্ড করলেন সুচিত্রা। সলিল যে সমকালীন আখ্যান তৈরি করছেন রবীন্দ্রনাথকে একান্ত নিজের করে,রবিভক্ত বাঙালি সেটা প্রায় বোঝেননি। অথচ কী দাপট আর কান্না ,দুইই মিশিয়ে সর্বার্থে সেই আধুনিক এবং রাজনৈতিক সঙ্গীতকে প্রতিষ্ঠা করেন সুচিত্রা মিত্র। পাশাপাশি মনে রাখতে হবে সলিলের অনুরোধে ‘প্রান্তরের গান আমার’ রেকর্ড করেও প্রকাশে আপত্তি জানান কণিকা বন্দ্যোপাধ্যায়, সেই একই সময়ে। কম্যুনিস্ট পার্টির বন্ধু, কিন্তু কর্পোরেট ক্যালকাটা ক্লাব এমনকি ‘সমাজ বিপ্লবকে স্তব্ধ করে দেওয়ার’ জন্য আয়োজিত আসরেও গাইছেন বাম জমানার সুচিত্রা মিত্র। কোথাও আবার মাইক্রোফোন বিকল, কিন্তু সুচিত্রা মিত্র বেপরোয়া অনমনীয়া—একা নিরাভরণ কন্ঠে গেয়ে চলেছেন ‘আমার সোনার বাংলা, আমি তোমায় ভালোবাসি’। ইন্দ্রধনুর স্তবকের মতো সেই গানের রেশ ময়দানের আকাশকে সৌভাগ্যবতী করে তুলছে, খোলা আকাশের নিচে অদূরে চৌরঙ্গীর সদ্য জ্বলে ওঠা আলোর দীপাবলি, সকলেই স্তব্ধ, মূহ্যমান। অশোক মিত্র লেখেন- “সুচিত্রা মিত্রকে এখনও দেখা যায়, সভায়-সমিতিতে হয়তো সমাজবিপ্লবের সম্ভাবনাকে গলা টিপে রোধ করবার জন্য যে সভা তাতেও…”।
তৃপ্তি মিত্রের স্মরণসভায় গাইছেন সুচিত্রা মিত্র। কন্ঠ বশে নেই। গাইছেন না কোনও প্রথাসিদ্ধ স্মরণসভার জন্য প্রায় প্রত্যাশিত পূজা পর্যায়ের গান। গাইছেন- “বনে যদি ফুটল কুসুম, তবে নেই কেন সেই পাখি, নেই কেন!” প্রত্যেকটি ‘কেন’ উচ্চারণ রাঙা হতে থাকে নানা স্তরের স্বরে। ‘কেন?’ ‘একা’। বিখ্যাত ‘কৃষ্ণকলি’ গানের ‘আলের ধারে দাঁড়িয়ে ছিলেম একা’- সেই ‘একা’-র সা থেকে মধ্যমে যাওয়ার অনন্ত শূন্যতা। সুচিত্রা মিত্র দাঁড়িয়ে থাকেন সেখানে ‘একা’ এবং ‘একক’-এর মাঝের জমিতে। অথচ একত্রতার সাধনা নিয়েই তো রবীন্দ্রনাথ গড়েছিলেন তাঁর আশ্রম, একত্রতার এক গভীর ক্রমান্বয়ে সুচিত্রা মিত্ররা তো জড়ো হয়েছিলেন গণনাট্যের মাঠে? তবে কি এতগুলি বিরোধ নিয়ে সুচিত্রা মিত্র হয়ে উঠেছিলেন এক কালান্তরের স্বর?

নবনীতা-অমর্ত্যর বিবাহ আসর, যেখানে আগুন নয়, জীবন্ত মানুষের সামনে ক্ষিতিমোহন সেন-এর বৈদিক মন্ত্র পাঠের সাথে নির্বাচিত রবীন্দ্রগান গাইতে ডাক আসে সুচিত্রা মিত্রেরই।
আটের দশকে বাম আমলে যতীন চক্রবর্তী ঊষা উত্থুপকে মহাজাতি সদনে গাইবার অনুমতি দেননি। অছি পরিষদের সভায় ‘অপসংস্কৃতি’-র অভিযোগ আনা হয়। হাইকোর্টে মামলা করে জিতে মহাজাতি সদনে গান গাইলেন ঊষা উত্থুপ। সংস্কৃতির শোভনতা নিয়ে যখন খবরের কাগজে আমবাঙালির তরজা তুঙ্গে, তখন পশ্চিমবঙ্গ সরকারের আয়োজনে বহু বিতর্কিত জলসা হোপ-৮৬, তাতে বলিউডের তারকাদের সঙ্গে বিজ্ঞাপনে নাম ও ছবি- সুচিত্রা মিত্রের। আর সেই বছরেই, রবীন্দ্র জন্মের একশো পঁচিশতম বর্ষে, সুচিত্রা মিত্র মগ্ন হচ্ছেন নানা অ্যাকাডেমিক কাজে। রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ে রবীন্দ্রগানের সিলেবাসে নিয়ে এসেছেন তার আগে নানা জরুরি পাঠ, নানা ডিসকোর্স। এই বিভাগটিও তৈরি হয়েছে তাঁর হাতেই।
তর্জমা করছেন দুর্দান্ত, ছোটোদের জন্য লিখছেন ছড়া, নিজের হাতে করছেন অনবদ্য কুটুম-কাটাম, নরুণ দিয়ে চক কেটে গড়ছেন ছোট্ট পুতুল। এক ছাত্রীর বিয়ে ভেঙে যাচ্ছে, তিনি তাঁকে একান্তে ডেকে বলছেন নিজের সংসার ভেঙে যাওয়ার আখ্যান, বলছেন- “দ্যাখ, যখন আমার ঘর ভাঙছে, তখন আমি এই পুতুল গড়ছি…”।

আসলে সুচিত্রা মিত্রের ভেতরেও একটা কান্না ছিল। সেই অতল রোদনে ধুয়ে যেত সব বাইনারি। জেগে থাকত স্বর। নানা স্তরের, নানা পরিসরের স্বর। গানের স্বর, প্রতিবাদের স্বর, অভিমানের স্বর, একা মেয়ের চলার স্বর, আক্ষেপের স্বর, নীরবতার স্বর, সব স্বর মিলে তৈরি হত এক আশ্চর্য আলো। সেই আলো কখনো ভোরের, কখনো সন্ধ্যা প্রদীপের , কখনো পুড়তে থাকা পাঁজরের।

শুভ জন্মদিন, সুচিত্রা মিত্র।

Share with