‘রাজায়-রাজায়’ যুদ্ধে বিপন্ন ৬০ লক্ষ, ‘পাল্টা’ খেলার কোপে এবার প্রশাসন
সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়
একুশের বিধানসভা নির্বাচন থেকেই তৃণমূল যে ” খেলা হবে ” শ্লোগান তুলেছিল আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনেও তা থেকে রেহাই পায়নি নির্বাচন কমিশনও। এবার প্রথম দফার ভোটের ৪৮ দিন আগে রাজ্যে ভোটের নির্ঘণ্ট প্রকাশ করে পাল্টা খেলা শুরু নির্বাচন কমিশনের। ভোট ঘোষণার পরেই রাজ্যের মুখ্যসচিব ও স্বরাষ্ট্রসচিব সরিয়ে দেওয়ার পাশাপাশি রাজ্য পুলিশের ডিজি ও কলকাতার পুলিশ কমিশনারকেও বদল করার পথে কমিশন। একইসঙ্গে আদালতের ঘাড়ে দায় চাপিয়ে ৬০ লক্ষের বেশি বিচারাধীন ভোটারের ভোট ভাগ্য ঝুলিয়ে রেখে ভোট ঘোষণা করে নির্বাচন কমিশন রাজ্যের শাসক দলের স্ট্র্যাটেজির পাল্টা খেলা খেলেছে বলে মনে করছেন প্রশাসনের একাংশ।
লজিকাল ডিসক্রিপ্যান্সি বিতর্ক চলাকালীন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছিলেন “আমি এমন খেলা খেলব তোমরা ধরতেই পারবে না।” এরপর সুপ্রিম কোর্টে প্রধান বিচারপতির বেঞ্চে একজন মুখ্যমন্ত্রী হয়ে মমতার সওয়াল করার নজিরবিহীন ঘটনা তোলপাড় করলেও শেষ পর্যন্ত ৬০ লক্ষ ৬ হাজার ৬৭৫ ভোটারের ভোটভাগ্য নির্ধারণে বিচারব্যবস্থার হস্তক্ষেপের সিদ্ধান্ত নেয় সুপ্রিম কোর্ট। পরবর্তীতে বিচারাধীন ভোটারদের আপিল গ্রহণের জন্য বিশেষ ট্রাইব্যুনাল গঠনেরও নির্দেশ দেওয়া হয়। সবমিলিয়ে বিচারব্যবস্থার এই সার্বিক নিয়ন্ত্রণ পরোক্ষে পাল্টা খেলার সুযোগ করে দেয় কমিশনকে। গত মঙ্গলবার মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমারকে বিচারাধীন ভোটারদের জন্য সম্পূর্ণ সাপ্লিমেন্টারি তালিকা প্রকাশের আগেই নির্বাচন কমিশন রাজ্যে ভোট ঘোষণা করবে কিনা তা নির্দিষ্টভাবে জানতে চাওয়া হলেও তিনি কোন সদুত্তর দেননি। তাঁর এই “না বলা বাণী” যে অন্য ইঙ্গিত দিচ্ছে তা সেদিনই স্পষ্ট হয়েছিল। বাস্তবে তাঁর (জ্ঞানেশ কুমার) মাথায় যা ছিল তারই প্রতিফলন ঘটল রবিবার। বিচারাধীন ভোটারদের একটি নামেরও নিষ্পত্তির আগেই হল ভোট ঘোষণা। যে ট্রাইব্যুনাল গঠনের নির্দেশ দিয়েছে সুপ্রিম কোর্ট এখনও পর্যন্ত তা নিয়ে কোনও হেলদোল দেখা যায়নি। রাজ্যের সিইও ইতিমধ্যেই জানিয়েছেন, আদালতের পদক্ষেপে গোটা বিষয়টি আরও জটিল হয়েছে। কমিশনের নিয়ন্ত্রণে থাকলে অনেক সুরাহা মিলত ভোটারদের। অর্থাৎ পরোক্ষে রাজ্যের শাসকদলের আদালতের দ্বারস্থ হওয়াকেই এই পরিস্থিতির জন্য দুষছেন কমিশনের কর্তারা। পাশাপাশি তৃণমূলের ” খেলা হবে ” মনোভাবের পাল্টা কৌশল হিসেবে বিচার ব্যবস্থাকেই ‘ শিখন্ডী ‘ হিসেবে দাঁড় করিয়ে উদ্ভূত পরিস্থিতি নিয়ে নিজেদের দায় এড়াতে চাইছে নির্বাচন কমিশন বলে মত প্রশাসনিক কর্তাদের। যেন ‘ রাজায়-রাজায় যুদ্ধে ‘ প্রাণান্ত বিপন্ন ভোটাররা। শুধু বিচারাধীন ভোটার নয় নিরপেক্ষতার প্রশ্ন তুলে প্রশাসনের অন্দরেও ভোলবদল করতে চায় নির্বাচন কমিশন।
নির্বাচনের আগেই পুলিশ ও প্রশাসনের শীর্ষপদে রদবদল করেছিল নবান্ন। এর মধ্যে অতিরিক্ত দায়িত্ব হিসেবে স্বরাষ্ট্র সচিব পদ বিবেচিত হয়। স্বাভাবিকভাবেই এই পদে যে রদবদল হচ্ছেই তা আগেই ইঙ্গিত দিয়ে স্বরাষ্ট্রসচিব জে পি মিনাকে অগেই ভিনরাজ্যে নির্বাচনী পর্যবেক্ষক হিসেবে মনোনীত করে কমিশন। রাজ্যের অনুরোধ এক্ষেত্রে গ্রাহ্য করেনি কমিশন। অবশেষে ফের একজন মহিলাকেই ( সংঘমিত্রা ঘোষ) পুর্ণ সময়ের স্বরাষ্ট্রসচিবের দায়িত্ব দিল নির্বাচন কমিশন। পাশাপাশি মুখ্য সচিব নন্দিনী চক্রবর্তীকে সরানো যে সময়ের অপেক্ষা তা আগেই ইঙ্গিত মিলেছিল। অভিযুক্ত ইআরও এবং এইআরও দের বিরুদ্ধে শাস্তির সুপারিশ কার্য করে টালবাহানা, কমিশন অভিযুক্ত আধিকারিক এর পক্ষ সমর্থন করে কমিশনকে লেখা পাল্টা যুক্তি, কমিশন নির্দেশিত বিভিন্ন সরকারি পদক্ষেপে দীর্ঘসূত্রিতা ইত্যাদি একাধিক কারণে মুখ্য সচিব অপসারণের প্রেক্ষাপট তৈরি ছিল। অবশেষে ভোট ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই তা কার্যকর করে ১৯৯৩ সালের আইএএস দুষ্মন্ত নারিয়ালা কে রাজ্যের মুখ্যসচিবের দায়িত্ব দিয়েছে কমিশন। এমনকি অপসারিত নন্দিনীকে নির্বাচন সংক্রান্ত কোনও দায়িত্ব দেওয়া যাবে না বলেও উল্লেখ করা হয়েছে। রাজ্যের নতুন ডিজি হলেন সিদ্ধিনাথ গুপ্তা, কলকাতা পুলিশের নতুন কমিশনার হলেন অজয় কুমার নন্দ এবং রাজ্যের নয়া এডিজি আইনশৃঙ্খলা অজয় মুকুন্দ রানাডে।

