রাজ্যে ভোট বুথের নয়া ডেটাবেসের ভাবনা, যুক্ত হবে পাবলিক ডোমেইন
সুদীপ্ত চট্টোপাধ্যায়
নির্বাচন কমিশনের নয়া নিয়মে রাজ্যে বাড়তে চলেছে ভোট বুথের সংখ্যা। বর্তমানে ৮০ হাজার ৬৮১টি বুথের সঙ্গে প্রায় ১৪ হাজার নতুন বুথ সংযুক্ত হওয়ার সম্ভাবনা। বুথগুলির নির্দিষ্ট অবস্থান, প্রতিটি বুথের পরিকাঠামোর হাল-হকিকৎ সম্বন্ধে নির্দিষ্ট ধারণা বা তথ্য রাখার জন্য এবার একটি সুনির্দিষ্ট ডেটাবেস বা তথ্যপঞ্জি তৈরি করতে চায় রাজ্য মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দপ্তর।
মূলত বুথের নির্দিষ্ট অবস্থান সহ কোন বুথে র্যাম্প রয়েছে বা নেই, দরজা-জানলার অবস্থা কেমন, বৈদ্যুতিক ওয়ারিং সিস্টেম ঠিকমতো রয়েছে কিনা তা একনজরে জানার মত কোনও তথ্য নেই রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দপ্তরের কাছে। কমিশনের গাইডলাইন অনুযায়ী একটি বুথের পরিমাপ নিদেনপক্ষে ২০০ স্কয়ার মিটার কিনা, বুথে ঢোকা-বেরনোর দুটি করে দরজা আছে কিনা, পানীয় জল, শৌচালয়ের সুব্যবস্থা রয়েছে কিনা অথবা
একটি প্রধান বুথ থেকে অতিরিক্ত বা সহকারি বুথের দূরত্ব কতটা তা জানতে হলেও ভরসা জেলা অথবা ব্লক স্তরের প্রশাসনের দেওয়া তথ্য। জেলার পক্ষ থেকে ইসিআইনেট-এ যেটুকু নথিভুক্ত করা হবে সেটাই তথ্য হিসেবে ব্যবহার করতে হয় রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দপ্তরকে।
কারণ রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দপ্তরের কাছে এ ব্যাপারে নির্দিষ্ট কোনও তথ্যপঞ্জি বা ডেটাবেস নেই। সেক্ষেত্রে সব সময় আপডেট তথ্য নাও মিলতে পারে বলে জানিয়েছেন পদস্থ আধিকারিকরা। এমনকি পুরনো বুথে পরিকাঠামোর বদল করতে হলে সাম্প্রতিক অতীতে সেই বুথে একই কাজে অর্থ বরাদ্দ হয়েছে কিনা তারও স্পষ্ট তথ্য নেই রাজ্য মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দপ্তরে। অথচ ফিবছর নির্বাচনী খরচ বাড়ছে, নতুন বুথ তৈরি বা পুরনো বুথের পরিকাঠামো উন্নয়নে খরচ বা বরাদ্দ বাড়াতে হচ্ছে। বুথগুলি সম্বন্ধে কোনও স্বচ্ছ ধারণা না থাকায় নির্বাচন পরিচালনার মূল দায়িত্ব যার হাতে সেই মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিককে নির্বাচন কমিশনের কাছে যুক্তি ও তথ্য অনুযায়ী রিপোর্ট দেওয়ার ক্ষেত্রেও সীমাবদ্ধতা থেকে যায়। এই পরিস্থিতিতে এব্যাপারে স্বয়ংসম্পূর্ণ হতে নতুনভাবে রাজ্যের ভোটের বুথগুলির নির্দিষ্ট ডেটাবেস বা তথ্যপঞ্জি তৈরি করতে চায় রাজ্য সিইও দপ্তর। সংশ্লিষ্ট জেলা প্রশাসন অথবা ব্লক প্রশাসনকে সঙ্গে নিয়েই অনলাইনে এই ডেটাবেস বা তথ্যপঞ্জির সঙ্গে সরাসরি যুক্ত থাকবে রাজ্য সিইও দপ্তর। এই অনলাইন ডেটাবেস পাবলিক ডোমেইনে তুলে দেওয়ারও চিন্তাভাবনা রয়েছে সিইও দপ্তরের। সেক্ষেত্রে যাদের ভোট দানের জন্য এই বুথ তৈরি করা সেই ভোটাররা তাদের ভোটের বুথে কি কি পরিকাঠামোর সুবিধা পাবেন তাও জানা সম্ভব হবে।
অতীত অভিজ্ঞতা থেকে জানা গেছে, ফিবছর একই বুথে একই কাজের জন্য অর্থ বরাদ্দ হয়েছে। বিশেষভাবে সক্ষম ব্যক্তিদের জন্য বুথে যে র্যাম্প থাকার কথা তা প্রতিবছর তৈরি করার জন্য নির্বাচনী খাতে অর্থ বরাদ্দ করতে হয়েছে। যদিও কংক্রিটের এই র্যাম্প বছর বছর নির্বাচনে তৈরি করার ঘটনা যুক্তিহীন। এছাড়াও আরও একাধিক ক্ষেত্রে বারবার সংস্কারের জন্য অর্থ বরাদ্দ করতে হয়েছে নির্বাচন কমিশনকে। এধরনের নানা তথ্য রাজ্য সিইও দপ্তরের হাতে উঠে এসেছে। এতদিন পর্যন্ত রাজ্যজুড়ে ভোটের বুথ তৈরি বা তার পরিকাঠামো উন্নয়নে কোনও নির্দিষ্ট এজেন্সি কাজ করেনি। কোথাও পঞ্চায়েত আবার কোথাও জেলা পরিষদের নিযুক্ত এজেন্সি, কখনো বিডিও অফিস আবার কোথাও খোদ স্কুলের প্রধান শিক্ষক এজেন্সি নিয়োগ করে বা নিজেই লোক ঠিক করে বুথের কাজ করিয়েছেন। জেলাসদর গুলিতে মহকুমা শাসকের মাধ্যমে কোথাও কাজ হয়েছে আবার কোথাও সরাসরি জেলা শাসকের দপ্তরের মাধ্যমে এজেন্সি নিয়োগ করে কাজ করা হয়েছে। বিভিন্ন এলাকায় বিভিন্ন এজেন্সি এমনকি ব্যক্তিগত উদ্যোগেও কাজ হওয়ায় রাজ্যে ভোটের বুথ সংক্রান্ত সুনির্দিষ্ট কোন ডেটাবেস বা তথ্যপঞ্জি তৈরি করা সম্ভব হয়নি। এই পরিস্থিতিতে বছর বছর নির্বাচনী খাতে খরচ যেমন বৃদ্ধি পাচ্ছে তেমনি একই ভোটের বুথে ফিবছর একই কাজের জন্য নির্বাচনী বরাদ্দ করা হচ্ছে কিনা সে ব্যাপারেও নিশ্চিতভাবে সদুত্তর মেলেনি।
ছাব্বিশের নির্বাচনের জন্য রাজ্যে বর্ধিত ভোটের বুথ তৈরি এবং বর্তমান বুথগুলির পরিস্থিতি খতিয়ে দেখে উপযুক্ত পরিকাঠামো তৈরির জন্য রাজ্য সরকারি সংস্থা ম্যাকিনটোস বার্ন-কে দায়িত্ব দিয়েছে মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দপ্তর। ম্যাকিনটোস বার্ন রাজ্যজুড়ে নির্বাচনী বুথগুলির অবস্থা খতিয়ে দেখবে। মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দপ্তরের পরামর্শ অনুযায়ী বুথগুলির পরিকাঠামো তৈরি করবে ওই সরকারি সংস্থা। প্রতিটি বুথের তথ্য অনলাইনে নথিভুক্ত করা থাকবে। যে ডেটাবেস বা তথ্যপঞ্জির সঙ্গে যুক্ত থাকবে রাজ্যের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিকের দপ্তর থেকে প্রশাসনিক আধিকারিকসহ বিএলওরাও। এই পদ্ধতির মাধ্যমে নির্বাচনী খাতে খরচ যেমন নিয়ন্ত্রণে রাখা সম্ভব হবে তেমনি বুথ নির্মাণের নামে দুর্নীতি বা বেহিসাবি খরচ যথেষ্ট কমবে বলেও মনে করছেন রাজ্য সিইও দপ্তরের আধিকারিকরা। সর্বোপরি অনলাইন পদ্ধতিতে কাজ হওয়ায় সুনির্দিষ্ট ডেটাবেস বা তথ্যপঞ্জি তৈরি হলে ভোটের বুথগুলি সম্পর্কে প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তিদেরও স্বচ্ছ ও সম্পূর্ণ ধারণা থাকবে এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় আরও বেশি স্বচ্ছতা আনা সম্ভব হবে বলেও মনে করা হচ্ছে।
আর এই পদ্ধতির সঙ্গে সাধারণ মানুষকে যুক্ত করার ফলে ভোটের বুথগুলি সম্পর্কে ভোটারদেরও একটি স্বচ্ছ ধারণা তৈরি হবে। যেহেতু এই ডেটাবেসে যুক্ত থাকবেন সাধারণ মানুষও তাই নির্বাচন প্রক্রিয়ায় একেবারে তৃণমূল স্তরে যিনি দায়িত্ব পালন করেন সেই বুথ লেভেল অফিসার বা বিএলও সংশ্লিষ্ট বুথ সম্পর্কে নিজের দায়িত্বও এড়াতে পারবেন না বলেই মনে করা হচ্ছে।

